ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত একটি কৌশলগত চাপের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ একাধিকবার চেষ্টা করেও পার হতে পারেনি।এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে,যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অস্বস্তি।
১. যুদ্ধ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে ইরান হরমুজ প্রণালিতে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে।এই প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হওয়ায়, ইরান এখানে প্রতিটি জাহাজের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে,বিশেষ করে যেগুলোকে তারা কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল মনে করছে।
২. বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে ইরানের অসন্তোষ
বিশ্লেষকদের মতে, মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান নিয়ে।ইরানে হামলার পর বাংলাদেশ একটি বিবৃতিতে ইরানের পাল্টা আক্রমণের সমালোচনা করে কিন্তু সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলার সরাসরি নিন্দা করা হয়নি, পরবর্তীতে শোক প্রকাশ করা হলেও তা ইরানের কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি।এ কারণে তেহরান মনে করছে, বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে তাদের পক্ষে অবস্থান নেয়নি।ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী প্রকাশ্যেই বলেছেন,বাংলাদেশের অবস্থান “স্পষ্ট নয়”।
৩. খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়।কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী:যথাযথ শোক প্রকাশে বিলম্ব,দূতাবাসে আনুষ্ঠানিক শোকপুস্তকে স্বাক্ষর না করা,এসব বিষয় ইরানের দৃষ্টিতে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
৪. সামরিক ও কৌশলগত চাপ প্রয়োগ
হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের জন্য একটি কূটনৈতিক লিভারেজ (চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার)।বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জাহাজ আটকে রেখে ইরান মূলত: আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা,নিজেদের অবস্থান জোরালো করা,আলোচনায় সুবিধা আদায়, এই লক্ষ্যগুলো সামনে রাখছে।
৫. বাস্তব পরিস্থিতি: ‘বাংলার জয়যাত্রা’
প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বহন করছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন ‘বাংলার জয়যাত্রা’। দুই দফা চেষ্টা করেও হরমুজ পার হতে পারেনি,বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।ইরান বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ পার হতে দিচ্ছে না মূলত:
১.যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কঠোর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ
২.বাংলাদেশের অস্পষ্ট বা ভারসাম্যহীন কূটনৈতিক অবস্থান
৩.খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ
৪.কৌশলগত চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে জলপথ নিয়ন্ত্রণ শেষ কথা
এটি শুধুমাত্র একটি জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনা নয় বরং এটি দেখায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক অবস্থান কীভাবে সরাসরি বাণিজ্য ও নৌ-পরিবহনকে প্রভাবিত করতে পারে।
সমাধান এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে ঢাকা ও তেহরানের কূটনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর। বিবিসি বাংলা
রিপোর্টার্স২৪/এসসি