সাদ্দাম হোসেন, ঠাকুরগাঁও: বাড়ির মূল ফটকে পা রাখলেই এক মুহূর্তের জন্য মনে হতে পারে আপনি কোনো বিয়েবাড়ির সুসজ্জিত গেট দিয়ে প্রবেশ করছেন। মাথার ওপর লতা-পাতার শামিয়ানা, আর সেখান থেকে ঝুলছে সারি সারি রসালো ও মিষ্টি আঙ্গুর। তবে এটি কোনো কৃত্রিম সাজসজ্জা নয়, বরং কৃষক আবুল কালাম আজাদের নিপুণ হাতে গড়া এক জীবন্ত বাগান। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের এই দৃশ্য এখন শুধু উপজেলা নয়, গোটা জেলা জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গ্রামের সাধারণ মানুষ ভালোবেসে তাকে এখন ডাকেন ‘আঙ্গুর কালাম’ নামে।
চার বিঘা জুড়ে বিস্তৃত এই বাগানের প্রতিটি সারিতে রয়েছে সবুজের সমারোহ। বিদেশের মাটিতে যে দৃশ্য সচরাচর দেখা যায়, সেই দৃশ্যই এখন ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত গ্রামে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ১৯৯৩ সালে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন আবুল কালাম আজাদ। সেখানে তিন বছর কঠোর শ্রম দেওয়ার পর তার মনে জেদ চাপে, যে শ্রম তিনি মরুভূমির দেশে দিচ্ছেন, সেই একই শ্রম নিজের দেশের মাটিতে দিলে সাফল্য আসবেই। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই ১৯৯৬ সালে দেশে ফেরা।
শুরুতে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে ভুট্টা চাষে সফলতা পেলেও তার মনে সুপ্ত ছিল আঙ্গুর চাষের বাসনা। সৌদি আরব থেকে ফেরার সময় একটি আঙ্গুরের লতা নিয়ে এসেছিলেন তিনি, কিন্তু উইপোকার আক্রমণে সেই স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। এরপর যেখানেই আঙ্গুর গাছ দেখেছেন, সেখান থেকেই চারা সংগ্রহ করেছেন। তবে প্রথম দিকের ফল ছিল ভীষণ টক। হাল না ছেড়ে পরিচিতজন ও বন্ধুদের মাধ্যমে তিনি ইউক্রেন, ইতালি, চীন ও ভারত থেকে উন্নত জাতের আঙ্গুরের চারা সংগ্রহ শুরু করেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০২৫ সালে তিনি প্রথম বড় ধরনের সাফল্যের মুখ দেখেন। বর্তমানে তার বাগানে বাইকুনু, অ্যাপোলো, সিলভা, ডিংশন, ব্ল্যাক ম্যাজিক, ব্ল্যাক জাম্বু, ব্ল্যাক রুবি ও উনুষ্ক সুলতানাসহ মোট ২২ প্রজাতির আঙ্গুর রয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি প্রজাতিই স্বাদে অত্যন্ত মিষ্টি।
বাগানের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কথা হয় দর্শনার্থী আল-মামুনের সঙ্গে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ফেসবুক আর লোকমুখে শুনে অনেক দূর থেকে বাগানটি দেখতে এসেছেন তিনি। সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা জানিয়ে মামুন বলেন, বাড়ির প্রবেশমুখে আঙ্গুর গাছের এমন গেট এর আগে তিনি কোথাও দেখেননি। তার কাছে মনে হয়েছে, তিনি যেন বাংলাদেশের কোনো গ্রামে নয় বরং ইউরোপের কোনো আঙুর বাগানে দাঁড়িয়ে আছেন। আরেক দর্শনার্থী গৃহিণী আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, বাজারের আঙ্গুর আর কালামের বাগানের আঙ্গুরের স্বাদের আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বিশেষ করে কালো ও লম্বাটে জাতের আঙ্গুরগুলো যে এত মিষ্টি হতে পারে, তা তিনি খাওয়ার আগে কল্পনাও করতে পারেননি।
নিজের এই সংগ্রাম ও সাফল্যের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে আবুল কালাম আজাদ জানান, তিনি মূলত ইউটিউব দেখে দেখে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই বাগানের পরিচর্যা শিখেছেন। প্রতিটি আঙ্গুর গাছ ৪৫ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে এবং গত বছর তিনি প্রতিটি গাছ থেকে ২০ কেজি করে ফল পেয়েছেন। এ বছর ১২০০ গাছ থেকে ২৫ কেজি করে ফলনের আশা করছেন তিনি। কালাম বলেন, ফেব্রুয়ারিতে পরিচর্যা শুরু করলে মার্চে ফল আসে এবং জুনের মধ্যে তা পুরোপুরি পেকে যায়। বছরে দুবার ফল পাওয়া যায় এই বাগান থেকে।
শুধু আঙ্গুর নয়, বর্তমানে তার নার্সারিতে কয়েক হাজার চারা রয়েছে যা তিনি বিক্রিও করছেন। পৈতৃক আট বিঘা জমি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ফসলের বৈচিত্র্যের গুণে আজ তার জমির পরিমাণ ৩৫ বিঘা।
আঙ্গুর চাষের এই অভাবনীয় বিপ্লব প্রসঙ্গে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা কৃষি অফিসার নাসিরুল আলম জানান, অদম্য ইচ্ছা থাকলে এ দেশের মাটিতেই বিদেশি ফলের সফল আবাদ সম্ভব। তিনি বলেন, সাধারণত আমাদের দেশে আঙ্গুর টক হওয়ার একটি প্রবণতা থাকে, কিন্তু কালাম সাহেব যে জাতগুলো সংগ্রহ করেছেন সেগুলো উচ্চফলনশীল ও মিষ্টি। কৃষি বিভাগ থেকে তাকে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং তার এই সাফল্য দেখে স্থানীয় অন্য কৃষকরাও এখন বাণিজ্যিকভাবে আঙ্গুর চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
স্ত্রী ও ১১ সন্তান নিয়ে এখন কালামের পরিপূর্ণ সংসার। কৃষি আর মাছের খামারের আয় দিয়ে সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন তিনি। ঠাকুরগাঁওয়ের বসন্তপুর গ্রামের সেই ‘টক আঙ্গুর’ এখন মিষ্টির জয়গান গাইছে, আর সেই মিষ্টির সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে জেলা জুড়ে।
রিপোর্টার্স২৪/মিতু