ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: নিজেকে ‘এক্স-মুসলিম’ হিসেবে পরিচয় দেয়া ভারতের আলোচিত ইউটিউবার সেলিম ওয়াস্তিক একটি হত্যা মামলায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় পর গ্রেপ্তার হয়েছেন। অপহরণ ও হত্যা মামলায় অভিযুক্ত এই ইউটিউবার ভুয়া পরিচয়ে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) এনডিটিভির খবরে বলা হয়, তাকে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের লোনি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, একটি গোপন সূত্রের ভিত্তিতে পুরোনো নথি, আঙুলের ছাপ ও ছবির মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার পর তাকে আটক করা হয়। অপহরণ, চাঁদাবাজি ও হত্যার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল তাকে।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯৫ সালের ২০ জানুয়ারি। দিল্লির এক সিমেন্ট ব্যবসায়ীর ১৩ বছর বয়সী ছেলে সন্দীপ বনসাল স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। পরদিন শিশুটির বাবার কাছে ফোন করে অপহরণকারীরা ৩০ হাজার রুপি মুক্তিপণ দাবি করে এবং লোনি ফ্লাইওভারের কাছে একটি বাসে টাকা রেখে যেতে বলে।
তবে পরিবার বিষয়টি পুলিশকে জানায় এবং গোকুলপুরি থানায় মামলা দায়ের করে। তদন্তে এক প্রতিবেশী জানান, শিশুটিকে ‘মাস্টারজি’ নামে পরিচিত এক লম্বা ছেলের সঙ্গে অটোরিকশায় যেতে দেখা যায়। এই সূত্র ধরে পুলিশ রামজাস স্কুল, দরিয়াগঞ্জের মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক সেলিম খানকে (বর্তমান সেলিম ওয়াস্তিক) শনাক্ত করে।
পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অপরাধ স্বীকার করেন এবং পুলিশকে মুস্তাফাবাদের একটি নালায় নিয়ে যান, সেখান থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার সহযোগী অনিলের নামও উঠে আসে, যিনি অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন। পরে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। শিশুটির স্কুল ব্যাগ, টিফিন বক্স ও ঘড়ি উদ্ধার করে আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
১৯৯৭ সালের ৫ আগস্ট সেলিম খান ও অনিলকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় করকরডুমা আদালত। পরে দুজনেই দিল্লি হাইকোর্টে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। ২০০০ সালের ২৪ নভেম্বর সেলিম অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়ে পালিয়ে যান এবং আর আদালতে ফেরেননি। ২০১১ সালে হাইকোর্ট তার সাজা বহাল রাখলেও তিনি তখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
পলাতক অবস্থায় নিজেকে মৃত ঘোষণা করে নতুন পরিচয়ে ‘সেলিম ওয়াস্তিক’ ও ‘সেলিম আহমেদ’ নামে বসবাস শুরু করেন তিনি। পরবর্তী ২৬ বছর তিনি হরিয়ানার কারনাল ও আম্বালাসহ বিভিন্ন এলাকায় লুকিয়ে থেকে পোশাক তৈরির কাজ করেন এবং ২০১০ সালে গাজিয়াবাদের লোনিতে গিয়ে নারীদের পোশাকের একটি দোকান চালু করেন।
এ সময় তিনি নিজেকে সমাজকর্মী ও ইউটিউবার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং ধর্ম ও সন্ত্রাসবাদবিষয়ক বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে পরিচিতি পান। এমনকি তার জীবন নিয়ে বলিউডে একটি বায়োপিক নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল। এর জন্য তিনি ১৫ লাখ রুপি অগ্রিম পেয়েছিলেন বলে জানা যায়।
এরই মধ্যে গত মাসে তার ওপর ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। গাজিয়াবাদের বাসায় ঢুকে দুই ব্যক্তি তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে এসে হেলমেট পরে ঘরে প্রবেশ করে এবং কয়েক মিনিট ধরে তাকে আঘাত করতে থাকে।
সেলিম মূলত ইসলাম ধর্ম বিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন এবং এই ধর্মের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য দিতেন। এরই জের ধরে তার ওপর হামলা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই সময় হামলাকারীরা বলতে থাকে, ‘তুমি আমাদের নবীকে অপমান করছ, তুমি আমাদের প্রভুকে অপমান করছ।’ এতে ঘাড়, পেট ও কানে গুরুতর আঘাত পান সেলিম। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নিকটস্থ হাসপাতালে এবং পরে দিল্লির গুরু তেগ বাহাদুর হাসপাতালে ভর্তি করে।
এ ঘটনায় তার ছেলে উসমান একটি মামলা দায়ের করেন। হামলায় জড়িত অভিযুক্ত জিশান ও তার ভাই গুলফাম পুলিশের সঙ্গে পৃথক দুটি এনকাউন্টারে নিহত হন। জিশান ১ মার্চ এবং গুলফাম ৩ মার্চ মারা যান।
তবে শেষ পর্যায়ে এসে নিজে ভুক্তভোগী হলেও রক্ষা হলো না সেলিম ওয়াস্তিকের। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর অবশেষে তাকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ১৯৯৫ সালের বহুল আলোচিত মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব