রিপোর্টার্স ডেস্ক: মধুর ‘মা’ ডাক শোনার জন্য একজন নারীকে কতোটা জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়, তা পৃথিবীর সব মায়েরাই জানেন। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্গম চরাঞ্চলগুলোতে এই ঝুঁকি যেন দ্বিগুণ। যমুনার উত্তাল ঢেউ আর বালুচরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন একজন গর্ভবতী নারী হাসপাতালের উদ্দেশে যাত্রা করেন, তখন তার কোলজুড়ে নতুন প্রাণের আগমনের আনন্দের চেয়ে জীবন-মৃত্যুর শঙ্কাটাই বড়ো হয়ে দেখা দেয়।
সিরাজগঞ্জের চৌহালি উপজেলার ঘোরজান চর। এনায়েতপুর ভার্সিটি ঘাট থেকে নৌকায় ঘণ্টাখানেক উজানে গেলে দেখা মেলে এই জনপদের। নৌকার মাঝি আল আমিনের কাছে প্রতিটি ঢেউয়ের গল্পে মিশে আছে কোনো না কোনো প্রসূতির হাহাকার।
তিনি বলছিলেন, আগে রোগী নেওয়ার সময় নৌকাতেই অনেকের ডেলিভারি হয়ে যেতো। যমুনার মাঝপথে যখন প্রসববেদনা ওঠে, তখন আমাদের আর করার কিছুই থাকে না।
নৌকা থেকে নেমে চরের একমাত্র বাহন মোটরসাইকেল। চালক জানালেন বর্ষা আর ঝড়ের রাতের সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা।
তিনি বলেন, অনেক সময় মাঝরাতে নৌকা পাওয়া যায় না। ভ্যান বা গরুর গাড়ি চলারও পথ নেই। মোটরসাইকেলে প্রসূতিকে নিয়ে ঘাটে যাওয়ার পথে কতোবার যে ঘাটের পাড়েই সন্তান প্রসব হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ১২৩ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমপিডিএসআর-এর তথ্য বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে মাতৃমৃত্যু কমলেও গত দুই বছরে তা আবার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। ২০২২ সালে প্রতি লাখে মৃত্যুর হার ছিলো ৬২ জন, যা ২০২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৯০-এ। এই মৃত্যুহার সমতলের চেয়ে চরাঞ্চলেই বেশি।
ঘোরজান চরের প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বাস। এখানে সেবা দিতে আসা ব্র্যাকের সুস্বাস্থ্য কর্মসূচির মিডওয়াইফ তাহরিমা আকতার তুলে ধরলেন এক ভয়াবহ চিত্র। তিনি জানান, চরাঞ্চলে কিশোরী মায়ের সংখ্যা অনেক বেশি। ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েরাই এখানে গর্ভধারণ করেন বেশি, যার ফলে প্রসবকালীন ঝুঁকিও বাড়ে বহুগুণ। প্রতি মাসে গড়ে ৬০ জন মা এখানে সেবা নিতে আসেন।
দীর্ঘদিন কোনো আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকলেও ছয় মাস আগে এখানে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যসেবা চালু করে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। সপ্তাহে একদিন চিকিৎসক এলেও কেন্দ্রটি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে প্রশিক্ষিত ধাত্রী ও মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টদের মাধ্যমে।
ব্র্যাকের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মাহফুজুর রহমান জানান, প্রসবসেবা, গর্ভকালীন যত্ন, আলট্রাসাউন্ড এবং টেলিমেডিসিনের সুবিধাও এখন চরের মানুষ পাচ্ছেন। জটিল রোগীদের ভিডিও কলের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ দেওয়া হয়।
ডা. জান্নাতুল পিয়া বলছিলেন, আগে অনেক মা জানতেনই না কবে শিশুটির জন্ম হবে। এখন আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে।
এতো কষ্ট, যমুনার উত্তাল ঢেউ আর দুর্গম চরের ধু-ধু বালুপথ—সব অনিশ্চয়তাকে তুচ্ছ করে চরাঞ্চলের নারীদের মা হওয়ার অদম্য ইচ্ছেটা ফুরায় না। ব্র্যাকের হাসপাতাল হওয়ার আগে শাহজাদপুরের দূরবর্তী হাসপাতালে যাওয়ার যে ভোগান্তি ছিলো, তা হয়তো কিছুটা কমেছে। কিন্তু চরের প্রতিটি প্রসূতি মায়ের কাছে ‘মা’ ডাক শোনাটা এখনো এক জীবনজয়ী যুদ্ধের নাম।
চরাঞ্চলের এই মায়েরা কেবল একটি সন্তানের জন্ম দেন না, তারা জন্ম দেন এক অবিরাম লড়াইয়ের গল্পের, যা যমুনার প্রতিটি ঢেউয়ের মতো চরের ইতিহাসে মিশে থাকে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব