নয়াদিল্লি: ভারতের যুবসমাজ সম্পর্কে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যঙ্গ ও রসাত্মক আন্দোলনের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এখন দেশের সবথেকে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলির অনলাইন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ক্ষোভ, পরিহাস এবং অনলাইন হিউমারকে হাতিয়ার করে শুরু হওয়া এই মিম-ভিত্তিক ডিজিটাল আন্দোলনটি মাত্র পাঁচ দিনে এক কোটিরও বেশি (১০ মিলিয়ন) ফলোয়ারের গণ্ডি পেরিয়ে গেছে। এর ফলে জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামে তারা ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে টেক্কা দিয়েছে।
কয়েক দশক ধরে সুকৌশলে গড়ে তোলা চিরাচরিত রাজনৈতিক আধিপত্যের এই দেশে, কেবল মাত্র ব্যঙ্গাত্মক কন্টেন্ট, রিলস এবং ভার্চুয়াল ক্ষোভের জোরে এই অনলাইন দলটি শাসক দলকে পেছনে ফেলে অভাবনীয় নজির তৈরি করেছে।
গত বৃহস্পতিবার '@cockroachjantaparty' নামের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি ১ কোটি ফলোয়ারের মাইলফলক স্পর্শ করে। এর বিপরীতে, বিজেপির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট '@bjp4india'-র ফলোয়ার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৮৭ লাখ (৮.৭ মিলিয়ন)। তবে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এখনও প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ (১৩.২ মিলিয়ন) ফলোয়ার নিয়ে এগিয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে ২০১২ সালে গঠিত আম আদমি পার্টির (আপ) ফলোয়ার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৯ লাখের কাছাকাছি। রাজনীতি ও রাজনীতির বাইরের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ইতিমধ্যেই এই ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় সওয়াল করেছেন, যার মধ্যে প্রখ্যাত ইউটিউবার ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ধ্রুব রাঠী এবং প্রবীণ সমাজকর্মী ও আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ অন্যতম।
এছাড়া তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজাদও এই ককরোচ জনতা পার্টিতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। প্রবীণ আইনজীবী ও সমাজকর্মী প্রশান্ত ভূষণ এই ব্যাপক ফলোয়ারের জোয়ারকে কাজে লাগিয়ে 'নিট' পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর ইস্যুটি তুলে ধরার জন্য সিজেপি-র প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ (আগের টুইটার) একটি পোস্টে তিনি লেখেন, "ককরোচ জনতা পার্টি মাত্র ৪ দিনে ইনস্টাগ্রামে ১০.৩ মিলিয়ন ফলোয়ার অর্জন করেছে, যা বিজেপির চেয়েও বেশি। যদি এটিকে বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তবে এর একটি ভালো ভবিষ্যৎ রয়েছে। অবশ্যই তাদের নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি তোলা উচিত এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের জবাবদিহিতা দাবি করা উচিত।" এর পাশাপাশি বৃহস্পতিবার তিনি দেশে কর্মসংস্থানের অধিকার আইন চালুর দাবি তোলার জন্য সিজেপি-র প্রতি আহ্বান জানান, যেখানে ২১ থেকে ৬০ বছর বয়সী সমস্ত নাগরিকের ন্যূনতম মজুরিতে কর্মসংস্থানের অধিকার থাকবে এবং তা না পারলে বেকার ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে।
অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে একটি সতর্কবার্তাও রয়েছে; সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলোয়ার পাওয়া আর বাস্তব রাজনীতিতে একটি দলের সদস্য সংগ্রহ করার মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে। সদস্যপদ মূলত দলের অন-গ্রাউন্ড বা মাঠপর্যায়ের উপস্থিতিকে নির্দেশ করে। সিজেপি-র এই অনলাইন ক্যাম্পেইনটি প্রথম আত্মপ্রকাশ করে গত ১৬ মে, যখন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ভারতীয় যুবকদের একটি অংশ সম্পর্কে করা মন্তব্যকে ঘিরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
গত ১৫ মে একটি মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি একজন আইনজীবীর সোশ্যাল মিডিয়ার আচরণকে উল্লেখ করে মন্তব্য করেছিলেন, "কিছু তরুণ রয়েছে যারা ককরোচের (আরশোলা) মতো, যাদের কোনো কর্মসংস্থান নেই বা পেশাগত কোনো জায়গা নেই। তাদের কেউ কেউ মিডিয়া, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া, কেউ আরটিআই কর্মী বা অন্যান্য অ্যাক্টিভিস্ট সেজে সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করে।" প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়, যার রেশ ধরে অভিজিৎ দিপকে নামের এক যুবকের হাত ধরে জন্ম নেয় সিজেপি।
বুধবার এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, "আমার মনে হয় এই মন্তব্যটি বেশি আঘাত করেছে কারণ এটি দেশের প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে এসেছে, যিনি আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রদানকারী সংবিধানের রক্ষক। যিনি আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করবেন, তিনিই কেবল মাত্র নিজস্ব মতামত প্রকাশের জন্য আমাদের ককরোচ বা পরজীবী হিসেবে তুলনা করছেন, এটাই সবথেকে বেশি কষ্টের।"
দিপকে আরও যুক্তি দেন যে এই মন্তব্য যদি কোনো রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে আসত তবে প্রতিক্রিয়া এতটা তীব্র হতো না। তিনি বলেন, "ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা যদি এই মন্তব্য করতেন, যা তাঁরা সাধারণত করেই থাকেন, তবে হয়তো এতটা শোরগোল হতো না। কিন্তু এটি এমন এক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে এসেছে যার কাজ আমাদের বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা।" যদিও প্রধান বিচারপতি পরে ১৬ মে তাঁর এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে জানান যে সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ তাঁর বক্তব্যকে "ভুলভাবে উপস্থাপন" করেছে। তবে এই ব্যাখ্যাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি এবং সিজেপি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের সোশ্যাল মিডিয়া যুদ্ধ বজায় রাখে। শুরুতে কেবলই আরেকটি সাধারণ ক্ষণস্থায়ী মিম পেজ মনে হলেও, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এই সিজেপি একটি পুরোদস্তুর ডিজিটাল আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জে তাদের কর্মসংস্থানহীনতা, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, রাজনৈতিক জবাবদিহিতার অভাব এবং দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের তৈরি হওয়া মানসিক দূরত্বের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছে।