স্টাফ রিপোর্টার: গরুর হাট, খানাখন্দ আর বিভিন্ন সড়কে সংস্কার কাজ শেষ না হওয়ায় এবারের ঈদযাত্রায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে পারেন ঘরমুখো মানুষ। দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে ৯৪টি অধিক যানজটপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ।
নির্মাণকাজ ও বৃষ্টিতে এরই মধ্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজধানী থেকে বের হওয়ার ৪টি প্রধান পথ।
হাইওয়ে পুলিশ চিহ্নিত ৯৪টি স্পটের মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে ২৫টি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২৫টি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২১টি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ৮টি, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ৭টি, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৭টি এবং ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ১টি এলাকা।
এসব স্পটের মধ্যে যানজট পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ হতে পারে সাভারের আশুলিয়ার বাইপাইল, কাঞ্চন সেতুর সংযোগ সড়ক ও এশিয়ান হাইওয়ের কিছু অংশ, কাঁচপুর সেতুর কাছে যাত্রামুড়া এলাকা এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায়।
তীব্র যানজটের ঝুঁকিপূর্ণ ৯৪ এলাকা
হাইওয়ে পুলিশ চিহ্নিত অধিক যানজটের ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে সাভারের আশুলিয়ার বাইপাইল মোড়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়াডিঙ্গি, চন্দ্রা ত্রিমোড়, দৌলতদিয়া ঘাট, পাটুরিয়া ঘাট, মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড, গোলড়া, নবীনগর, সাভার বাজার, হেমায়েতপুর, আমিনবাজার, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, সফিপুর, টঙ্গী বোর্ডবাজার, টঙ্গী ব্রিজ, আব্দুল্লাহপুর, গাজীপুরা, গাজীপুর চৌরাস্তা-ভোগড়া বাইপাস।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, গোড়াই, জামুর্কী, এলেঙ্গা, বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম সংযোগ সড়ক, সিরাজগঞ্জ রোড, হাটিকুমরুল গোলচত্বর, চান্দাইকোনা, নলকা সেতু এলাকা, বগুড়া বাইপাস, শেরপুর বটতলা, মোকামতলা, রানীরহাট, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা মোড়, রংপুর মহানগর প্রবেশমুখ, মিঠাপুকুর, বড় দরগাহ, সৈয়দপুর, চিরিরবন্দর, গোবিন্দগঞ্জ (দিনাজপুর), ফকিরেরহাট, কাটাখালী।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কাঁচপুর সেতু, মেঘনা সেতু, গোমতী সেতু, দাউদকান্দি, ইলিয়টগঞ্জ, কুমিল্লা পদুয়ার বাজার, চৌদ্দগ্রাম, ফেনী মহিপাল, বারইয়ারহাট, ভাটিয়ারী, চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড়, একে খান, শাহ আমানত সেতু, পটিয়া, দোহাজারী, চকরিয়া, ঈদগাঁও, রামু, উখিয়া, টেকনাফ।
মাওয়া চৌরাস্তা, শিবচর, ভাঙ্গা, ফরিদপুর কানাইপুর, রাজবাড়ী রাস্তার মোড়, ঝিনাইদহ হামদহ, যশোর নওয়াপাড়া, ফুলতলা, খানজাহান আলী সেতু, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ভাটিয়াপাড়া, বরিশাল নথুল্লাবাদ, ঝালকাঠি, ভোলা ইলিশা ফেরিঘাট, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী মাইজদী, সোনাপুর, চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড।
এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশ্বরোড, সরাইল, হবিগঞ্জ মাধবপুর, শায়েস্তাগঞ্জ, মৌলভীবাজার, শেরপুর (বগুড়া), জামালপুর, ময়মনসিংহ ত্রিশাল, ভালুকা, গৌরীপুর, নেত্রকোনা মোহনগঞ্জ সড়ক, সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকা এবং জাফলং সড়ক প্রবেশমুখ।
হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, এসব এলাকায় যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ঘটনা এড়াতে বিশেষ নজরদারি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
যেসব সড়কের বেহাল দশা
বাইপাইল মোড়ে রাস্তা মেরামত ও উন্নয়ন কাজ চলছে। এখানকার বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। একইভাবে কাঞ্চন ব্রিজের পশ্চিম পাশে রাস্তা মেরামত ও উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় এখানকার অবস্থাও শোচনীয়।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়াডিঙ্গিতে রাস্তা মেরামত ও উন্নয়ন কাজ চলছে এবং বাঘের বাজারে রাস্তায় খানাখন্দ রয়েছে। এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ এবং টিএমএসএস মেডিকেল হাসপাতালের সামনে এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলমান রয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ মায়ামণি মোড়ে ওভারপাস নির্মাণ কাজ চলমান থাকার কারণে এবং আশুগঞ্জ গোলচত্বরে ৬ লেনের নির্মাণ কাজ চলার দরুন যানজটের ঝুঁকি রয়েছে।
এছাড়া ভেলানগর বাসস্ট্যান্ড ও ইটাখোলা বাসস্ট্যান্ডে ফ্লাইওভারের কাজ চলমান থাকায় রাস্তা সরু হয়ে গেছে এবং ডাইভারশন রাস্তা দিয়ে সিঙ্গেল লেনে গাড়ি চলাচল করছে।
বিশ্বরোড গোলচত্বরে উভয় লেনে নির্মাণ কাজ, বরপা বাসস্ট্যান্ড ও তারাবো গোলচত্বরে মহাসড়কের উন্নয়ন কাজ এবং যাত্রামুড়া ব্রিজে রাস্তা মেরামত ও উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে।
গ্রীন ইউনিভার্সিটির সামনে এবং ছনপাড়ায় রাস্তা মেরামত ও উন্নয়ন কাজ চলছে। মদনপুর হতে বস্তুল পর্যন্ত এশিয়ান রোডে রাস্তা মেরামত, উন্নয়ন কাজ চলমান থাকার পাশাপাশি খানাখন্দ ও সরু রাস্তার সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া কন্টনমেন্ট মোড়ে রাস্তার মেরামতের কাজ এবং ঘাটাবাড়িয়া কলেজ গেটে নির্মাণাধীন নতুন ব্রিজের কাজ চলমান রয়েছে।
উদ্বিগ্ন যাত্রীরা
ঈদযাত্রায় ভোগান্তি ও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম উদ্বেগ দেখা গেছে। বাস চালক মোবারক হোসেন বলেন, রোজার ঈদের থেকে কোরবানি ঈদের সড়কে যানজট প্রভাবটা বেশি পড়ে। অনেকগুলো কারণ এর মধ্যে একটি হলো গরুর ট্রাক, গরুর বাজার।
তিনি বলেন, সবার আগে যানজট যদি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, যতগুলো ভাঙাচোরা সড়ক আছে সবগুলোই মেরামত করে চলাচল উপযোগী করতে হবে।
রাজধানীর উত্তর শাহজাহানপুর এলাকার ফার্নিচার ব্যবসায়ী আরিফ বলেন, ঈদযাত্রায় সড়কে চলাচলের সময় প্রধান আতঙ্ক যানজট, ডাকাতি, ছিনতাই। সরকারের দায়িত্ব যানজটমুক্ত, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা। আমরা ভোগান্তি চাই না।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, যানজট নিয়ন্ত্রণে সড়কে যানচলাচলে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে খানাখন্দ সংস্কার করে সড়ককে চলাচল উপযোগী করতে হবে। মহাসড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
যানজট নিয়ন্ত্রণে মাঠে পুলিশ-বিজিবি, থাকছে ড্রোন মনিটরিং
যানজট নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অতিরিক্ত পুলিশের সঙ্গে মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি। থাকছে ড্রোন ও সিসিটিভি মনিটরিং।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, সারা দেশে হাইওয়ে পুলিশের ৭৩টি থানা ও ৭টি পুলিশ ফাঁড়িসহ মোট ৮০টি কার্যক্রম পরিচালনাকারী স্থাপনা রয়েছে। আসন্ন ঈদুল আজহায় জনগণের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে হাইওয়ে পুলিশকে অতিরিক্ত এক হাজার পুলিশ সদস্য দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে অপরাধ দ্রুত শনাক্তের ব্যবস্থা থাকবে বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া ঈদযাত্রায় মহাসড়কে ড্রোন ব্যবহার করে যানবাহনের চলাচল, অপরাধীদের অবস্থান এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে বলেও জানান মুনতাসিরুল ইসলাম।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে মহাসড়কে যেন অতিরিক্ত যানজট সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও কাজ করছে পুলিশ। বিশেষ করে পশুবাহী যানবাহন ও যাত্রীবাহী পরিবহনের চাপ সামাল দিতে হাইওয়ে এলাকাগুলোতে বাড়তি নজরদারি রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রায়ই দেখা যায় যাত্রীবোঝাই বড় বাস যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাঝপথে বিকল হয়ে সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের রেকার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, ঈদের সময় সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি না করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই। একইসঙ্গে সরকারের সব সংস্থাকে সমন্বয়ের মাধ্যমে ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে দায়িত্ব পালনের অনুরোধ করেন তিনি।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেন, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং জনসাধারণের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে রাজধানীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। ঈদের সাত দিন আগে থেকে ঈদের পরবর্তী তিন দিন পর্যন্ত বিজিবি মোতায়েন থাকবে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব