বারান্দায় কেউ ছিল হয়তো
মাঝরাতে হঠাৎ মনে হয়, পৃথিবীটা আসলে
বহুদিন আগের কোনো পরিত্যক্ত স্টেশনঘর—
দেওয়ালে সেঁটে থাকা ছেঁড়া পোস্টারের নিচে
ঘুমিয়ে আছে বৃষ্টির গন্ধ, আর প্ল্যাটফর্মের
শেষ মাথায় কাঁপতে থাকা হলুদ বাতিটা
এখনো অপেক্ষা করে এমন এক ট্রেনের জন্য,
যা কোনোদিন আসবে না; আমি সেই বাতির নিচে
দাঁড়িয়ে নিজের ছায়াকে দেখি, মনে হয়
সে-ই বোধহয় বহু বছর আগে আমাকে
ছেড়ে চলে গেছে, শুধু অভ্যাসবশত
তার অন্ধকারটা এখানে পড়ে আছে এখনো।
ঝোড়ো হাওয়া এলে শরীরে কেমন
পুরোনো বাড়ির শব্দ জেগে ওঠে—
কাঠের আলমারি খুলে যাওয়ার শব্দ,
ভেজা দরজার ফাঁকে আটকে থাকা শৈশব,
বিদ্যুৎহীন সন্ধ্যায় দূরের আজানের সঙ্গে
মিশে থাকা মায়ের থালাবাসনের আওয়াজ;
অথচ এসবের কিছুই আর নেই,
শুধু স্মৃতিগুলো মৃত মাছের চোখের মতো
জলে ভাসে, তাকিয়ে থাকে, পচে যায় না
পুরোপুরি। আমি মাঝে মাঝে জানালার কাঁচে
আঙুল বুলিয়ে ছোট ছোট সূর্য আঁকি,
তারপর সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেলি—কারণ
আলো বেশিক্ষণ থাকলে
ভিতরের ধ্বংসস্তূপ দেখা যায়।
যারা খুব একা হয়ে যায়, তারা
একসময় রাস্তাকেও মানুষ ভাবতে শুরু করে;
দূরের লণ্ঠনকে মনে হয় কেউ ডাকছে,
অথচ কাছে গেলে দেখা যায় বাতাস
ছাড়া আর কেউ নেই। প্রতিটি পথই যেন
ভুলে যাওয়া কারো শিরা-উপশিরা—তার
ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়,
আমার আগেও কেউ এই অন্ধকার
বহন করেছিল কি না। তারপর হঠাৎ কোনো
এঁদো খালের উপর ঝুঁকে থাকা মরচে ধরা
সাঁকো দেখে মনে পড়ে, মানুষের জীবন
আসলে খুব ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়া
এক কাঠের সেতু—উপরে এখনো
পায়ের শব্দ হয়, অথচ নিচে
বহু আগেই পচন শুরু হয়ে গেছে।
সময়েরও বোধহয় ক্লান্তি আছে; তাই কিছু বিকেল
হঠাৎ থেমে যায়। আকাশ তখন গরিব মানুষের
ব্যবহৃত নীল কম্বলের মতো ঝুলে থাকে শহরের উপর,
আর ভাঙা পাড়ে বাঁধা ডিঙিনৌকোগুলোকে মনে হয়
তারা বহুদিন আগে কোথাও যেতে চেয়েছিল,
কিন্তু জোয়ার এসে তাদের দড়ির ভিতরই বুড়িয়ে দিয়েছে।
আমি কাগজের নৌকা ভাসাই এখনো—জানি
তারা ডুবে যাবে, তবু ভাসাই; কারণ মানুষ
আশাহীন হয়ে গেলেও তার আঙুলের ভিতর
অভ্যাস বেঁচে থাকে, ঠিক মৃত গাছের
শরীরে জমে থাকা শ্যাওলার মতো।
লোকে বলে সুখী হও। কথাটা শুনলে আমার
পরিত্যক্ত ভোজের টেবিলের কথা মনে পড়ে—
সবাই উঠে গেছে, আলো নিভে এসেছে,
শুধু প্লেটের পাশে পড়ে আছে কয়েকটা
ঠান্ডা ভাতের দানা আর উল্টে থাকা
গ্লাসে জমে থাকা আঙুলের ছাপ। জীবন
বোধহয় এর বেশি কিছু না; সভ্যতার
গলায় যে এক টুকরো নীরবতা আটকে থাকে
তা কেউ গিলে ফেলতে পারে না,
ফেলেও দিতে পারে না।
নরকেরও ভোর হয় কোনো কোনোদিন।
কচুরিপানার ফাঁক দিয়ে হালকা আলো
উঠে আসে, দূরে কোনো অদৃশ্য মানুষ
হয়তো জাল ফেলছে জলে,
আর আমি বুঝতে পারি—অন্ধকার
কখনো আলোকে হারায় না, শুধু তার শরীরে
গন্ধ হয়ে লেগে থাকে বহুদিন।