স্টাফ রিপোর্টার: রাজধানীর গুলশান-বনানীর ঝকঝকে উঁচু ভবনের পাশেই যেন ঢাকার আরেকটি রূপ। টিনের চাল, বাঁশের বেড়া, সরু গলি আর ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তারে গড়া এই এলাকা কড়াইল বস্তি নামে পরিচিত।
যেখানে মানুষ সকাল বলতে বোঝে পানির জন্য লাইনে দাঁড়ানো, দুপুরের মানে আয়-রোজগারের অনিশ্চয়তা আর রাতের অর্থ ঘরভাড়ার চিন্তা নিয়ে ঘুম।
এই বস্তির মানুষ গত কয়েক মাসে নতুন একটি শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে, সেটি ‘ফ্যামিলি কার্ড’। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা সহায়তার অংশ হিসেবে এই কার্ডের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দেওয়া টাকা পাচ্ছে কিছু পরিবার। কিন্তু এই বস্তিতেই পাশাপাশি থাকা বহু পরিবার এখনও সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই কারও কাছে এটি সামান্য স্বস্তি, কারও কাছে অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, আবার কারও কাছে নতুন বঞ্চনার গল্প।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব পরিবার এখনও তালিকাভুক্ত হয়নি, তাদের বিষয়টি স্থানীয় সমাজসেবা অফিস যাচাই করবে।
সরকারি এই আশ্বাসের বিপরীতে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বেশ ভিন্ন। কড়াইলের ‘মায়ের দোয়া স্কুল গলি’তে ছোট্ট একটি ঘরে থাকেন লাকী আক্তার। প্রায় ২০ বছর ধরে এই বস্তিতেই তার বসবাস। একসময় স্বামী ছিলেন, ছিল সংসারের ভরসা। কিন্তু এক বছর আগে জ্বরে মারা যান তিনি। তার আগে দীর্ঘদিন অন্ধ ছিলেন। এখন লাকীর পৃথিবী বলতে একা বেঁচে থাকা আর দূরে সরে যাওয়া সন্তানদের স্মৃতি।
দুই ছেলে ও এক মেয়ের সবাই বিয়ে করে আলাদা সংসার গড়েছে। বয়সের ভার আর অভাবের চাপে নুয়ে পড়া লাকী এখনও বিধবা ভাতা পাননি। ফ্যামিলি কার্ডের আশায় তিনি বারবার কাগজ জমা দিয়েছেন।
তার কণ্ঠে প্রকাশ পেল জমে থাকা ক্ষোভ। প্রতিবেদককে লাকী বলেন, ‘কতো কিছু জমা দিছি, কিছুই পাই নাই।’
এই বৃদ্ধা ঢাকার ভোটার। তিনি যে বাড়িতে থাকেন, সেই বাড়ির ২১টি পরিবারের মধ্যে মাত্র দুইজন নারী সহায়তা পেয়েছেন। বাকি ১৯ পরিবার এখনও অপেক্ষায়।
‘আমরা একসাথে কাগজ জমা দিলাম। দুইজন পাইছে, বাকিরা পাই নাই। তখন মন খারাপ তো হইবই’, বলেন লাকী।
একই গলিতে থাকেন খোদেজা বেগম। কুমিল্লার হোমনা থেকে তিনি বহু বছর আগে ঢাকায় এসেছিলেন ভালো জীবনের আশায়। ২৫ বছর ধরে কড়াইলের খ ব্লকে তার বসবাস। স্বামী মারা গেছেন ৮-৯ বছর আগে। এক ছেলে ও তিন মেয়েকে বড় করেছেন মানুষের বাসায় কাজ করে।
এরই মধ্যে তিনবার আগুনে পুড়েছে তার ঘর। খোদেজা বেগম বলেন, ‘আগুন লাগলে কিছুই থাকে না মা। আবার নতুন কইরা শুরু করতে হয়।’ বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা– কোনোটিই পাননি। ফ্যামিলি কার্ডও জোটেনি তার ভাগ্যে।
একই গলির আকলিমা আক্তারও ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন করেছিলেন। সেটার আর কোনো খবর পাননি। অথচ এলাকার মানুষদের বলা হয়েছিল, ‘যারা এখনও পাননি, নিরাশ হবেন না। আপনারাও পাবেন।’ কিন্তু সেই ‘পাওয়া’ এখনও হয়নি।
একই আক্ষেপ কুদ্দুসের বাড়ির আরও অনেক ভাড়াটিয়ার। তারা বলছেন, একসঙ্গে আবেদন করেও কেউ কার্ড পেয়েছেন, কেউ পাননি। এ নিয়ে তৈরি হয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ।
অনেকেই বলেন, ‘যেখানে ১০টা পরিবার একসাথে কাগজ জমা দিলাম, ওইখান থেকে দুইজন পাইছে, বাকিরা পাই নাই। তখন মানুষ তো কথা বলবেই।’
তবে যারা কার্ড পেয়েছেন, তাদের কাছে এটি কিছুটা স্বস্তির। তানিয়া আক্তার নামে এক গৃহিণী জানান, তার মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে দুই দফায় ২ হাজার ৫০০ টাকা করে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘আইডি কার্ডের ফটো, ছবি, সিগনেচার, বিকাশ নম্বর সব নিছে। পরে মোবাইলে টাকা আইছে। দুইবার ২ হাজার ৫০০ টাকা পাইছি।’
তবে সহায়তা কতদিন চলবে বা টাকা না এলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে– এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না এই গৃহিণী।
তানিয়া বলেন, ‘কেউ কিছু বলে নাই। টাকা না আসলে কার কাছে জানাবো, সেটাও জানি না।’
চায়না খাতুন নামের আরেক নারী জানান, তিনি কার্ড হাতে পাননি, তবে বিকাশে টাকা পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কার্ড দেয় নাই, কিন্তু বিকাশ নম্বর নিয়ে নিছে। পরে টাকা আইছে।’
কড়াইলের বাসিন্দা হোসেন ২০০৯ সাল থেকে এখানে থাকেন। পেশায় সেলুনকর্মী। তিনি দাবি করেন, পুরো এলাকায় হাজার হাজার মানুষ আবেদন করলেও খুব কমসংখ্যক মানুষ সহায়তা পেয়েছেন।
‘৩৭ হাজার লোককে কার্ড দেওয়ার কথা ছিল। পাইছে হয়ত চার হাজার-চার হাজার দুইশর মতো’, বলেন তিনি।
বুধবার (২০ মে) কড়াইলের বিভিন্ন ব্লক ঘুরে দেখা যায়, কার্ড পাওয়া ও না পাওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ হাতে কার্ড পেয়েছেন, কেউ শুধু মোবাইলে টাকা পেয়েছেন, আবার কেউ আবেদন করেও কোনো সাড়া পাননি।
পেয়ে স্বস্তি, বঞ্চনায় আক্ষেপ
তবে এই সহায়তা যে কারও কারও জীবনে সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে, তার উদাহরণ হালিমা বেগম। প্রায় ৩০ বছর ধরে কড়াইলে বসবাস তার। স্বামী মারা গেছেন ২০১৭ সালে। তিনবার আগুনে পুড়ে নিঃস্ব হয়েছেন, আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে এখন একাই লড়াই করছেন জীবনের সঙ্গে।
হালিমা বলেন, ‘আমার কিডনির সমস্যা, হার্টের সমস্যা। আগুন লাগার পরে পড়ে গিয়া পায়ে ব্যথা পাইছিলাম। তিন মাসের ভাড়া বাকি ছিল। ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পাইয়া আমি রুম ভাড়া দিছি।’
তার চোখেমুখে কৃতজ্ঞতা থাকলেও আক্ষেপও কম নয়। ‘আমি এখন পর্যন্ত একটা বিধবা কার্ডও করতে পারলাম না। খুব দরকার আমার’, বলেন তিনি।
কড়াইলের ক ব্লকে আনোয়ারা টেলিকম নামের ছোট্ট একটি দোকানে বিকাশের টাকা তুলতে ভিড় করেন ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া নারীরা। দোকানি ইমামের ভাই আলাউদ্দিন বলেন, ‘যারা পাইছে, সবাই গরিব মানুষ। কিন্তু অনেক গরিব মানুষ আবার পায়ও নাই।’
বুধবার তপ্ত রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় হাফিজা বেগমকে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মার্চ মাসে প্রথমবার মোবাইলে ২ হাজার ৫০০ টাকা ঢোকে। এপ্রিলেও এসেছে। সেই টাকা দিয়ে তিন মাসের বকেয়া ঘরভাড়া দিয়েছেন তিনি।
‘ঘরভাড়া দিতে না পারলে ঘর থেইকা বাইর কইরা দিত’, বলেন হাফিজা বেগম। কিন্তু মে মাস শেষ হতে চললেও এখনও কোনো মেসেজ আসেনি। এ নিয়ে শঙ্কার কথা উঠে এলো তার কণ্ঠে, ‘ঈদের আগে টাকা পাইমু কি না, তাও জানি না। কার কাছে যামু, সেটাও জানি না।’
কড়াইলের আরেক বাসিন্দা সাবিনা আক্তারের কাছে এই সহায়তা যেন একটু নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ। স্বামী ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান, তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। তিন সন্তান নিয়ে সংসার।
সাবিনা বলেন, ‘রিকশার জমা, খাওয়া-পরা, পোলাপানের পড়ালেখা– সব মিটাইয়া শেষে ঘরভাড়া দিতে কষ্ট হইত। এখন অন্তত ঘরভাড়াটা ঠিকমতো দিতে পারি।’
কেউ আবার এই টাকা দিয়ে সন্তানের চিকিৎসা করাচ্ছেন, কেউ বাজার করছেন, কেউ ভাড়া দিচ্ছেন। আবার কেউ ছোট দোকানে পণ্য তুলছেন। কড়াইলের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মিম আক্তার বলেন, তার মায়ের নামে পাওয়া টাকা দিয়ে এখন তিনি যাতায়াত খরচ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি দিচ্ছেন।
বিভ্রান্তি আর অভিযোগ
তবে এই স্বস্তির মধ্যেও রয়েছে বিভ্রান্তি আর অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেকে আছেন যাদের নিজস্ব বাড়ি আছে, ভালো আয় আছে। তারাও তালিকায় ঢুকেছেন। আবার প্রকৃত দরিদ্র অনেক নারী বাদ পড়েছেন। কেউ হাতে কার্ড পাননি, শুধু মোবাইলে টাকা পেয়েছেন। কেউ আবেদন করে পরে আর কোনো খোঁজ পাননি। আবার কেউ কেউ এক মাসের টাকা পেয়েছেন। এপ্রিল মাস পার হয়ে গেলেও মোবাইলে আর কোনো ম্যাসেজ আসেনি।
কড়াইলের একটি গলিতে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগম বলছিলেন, ‘ওষুধ কিনতে পারি না। এই কার্ডটা পাইলে অন্তত ওষুধটা খাইতে পারতাম।’ তার কণ্ঠে অভিযোগের চেয়ে অসহায়ত্বই বেশি।
কড়াইলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য ও স্বচ্ছতা না থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কে কীভাবে নির্বাচিত হয়েছেন, কতজন পাবেন, কতদিন সহায়তা চলবে– এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই অধিকাংশ মানুষের। ফলে একই বস্তিতে কেউ যখন মোবাইলে সহায়তার টাকা পেয়ে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেন, তখন পাশের ঘরের আরেক পরিবার অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার হিসাব কষছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের মানুষের, বিশেষত নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালুর প্রতিশ্রুতি দেয়। এরই আলোকে সেই অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
এটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশের ১৪টি উপজেলায় (প্রতিটিতে একটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে) প্রায় ৬ হাজার ৫০০ পরিবার প্রথমে এই সুবিধা পাচ্ছে। প্রকল্পটির মেয়াদ চার মাস। এটি সফল হলে ধাপে ধাপে সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির স্লোগান হচ্ছে– ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ তৈরি করেছে।
হচ্ছে ডেটাবেজ, নিয়মিত সহায়তা তদারকি করবে সরকার
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ও অনিয়ম রোধে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি সুবিধাভোগীরা নিয়মিত টাকা পাচ্ছেন কি না সরকার তারও তদারকি করছে।
জানতে চাইলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি) মো. সাইফুল হক বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওপর রয়েছে। তাই কোনো উপকারভোগীর নাম তালিকায় না আসা, টাকা না পাওয়া বা অন্য কোনো জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে।
তিনি বলেন, যেসব পরিবার কাগজপত্র জমা দিয়েও এখনও তালিকাভুক্ত হয়নি, তাদের বিষয়টি স্থানীয় সমাজসেবা অফিস যাচাই করবে। আবার যারা এক মাস টাকা পেয়েছেন কিন্তু পরের মাসে পাননি, তারাও স্থানীয় সমাজসেবা কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
কড়াইল বস্তিতে ঠিক কতজনকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে বা এখন পর্যন্ত কতজন পেয়েছেন– এমন প্রশ্নের জবাবে মো. সাইফুল হক বলেন, এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে রয়েছে। কারণ মাঠপর্যায়ে তালিকা প্রস্তুত ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ তারাই পরিচালনা করছে।
তবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব