রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে এ মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলো।
সোমবার (১ জুন) বেলা ১১টায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত শুনানি শেষে অভিযোগ গঠনের এ আদেশ আদেশ দেন ৷ একইসঙ্গে আগামীকাল মঙ্গলবার (২ জুন) সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেছেন।
এদিন সকাল পৌনে আটটার দিকে প্রিজন ভ্যানে তাদের আদালতে আনা হয়। সোহেল রানাকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নাকে নারী হাজতখানায় রাখা হয়। শুনানিকালে ১১টার দিকে তাদেরকে এজলাসে নেয়া হয়। প্রথমে সোহেল রানাকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, মাথায় হেলমেট পড়িয়ে কাঠগড়ায় নেয়া হয়। এরপর নেয়া হয় স্বপ্নাকে। কাঠগড়ায় তিনি হাঁপাতে থাকেন। এরপর তার জ্যাকেট ও হেলমেট খুলে পুলিশ সদস্যরা তাকে মুখে পানি ঢালেন। এসময় বারবার তাকে জ্ঞান হারাতে দেখা যায়। সকাল ১১টা ৯ মিনিটে এজলাসে আসেন বিচারক।
শুনানিতে এ মামলা পরিচালনায় বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। অপরদিকে আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ আসামিদের নির্দোষ দাবি করেন।
পরে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনান। এসময় আসামি সোহেল রানা কথা বলতে চান, তবে তাকে অনুমতি দেয়া হয়নি। তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। এরপর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। একইসঙ্গে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামীকাল (২ জুন) নির্ধারণ করেন। ১১টা ২৯ মিনিটে বিচারক এজলাস ত্যাগ করে খাস কামরায় চলে যান।
এরপর কাঠগড়ায় একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন সোহেল ও স্বপ্না। এসময় স্বপ্নাকে সোহেল জানায় চিন্তা না করতে। তার (স্বপ্না) কোন দোষ নেই বলে জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানান সোহেল। এরপর ১১টা ৩৮ মিনিটে স্বপ্নাকে কাঠগড়া থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় হাজতখানায় নেয়া হয়। এসময় স্বামী সোহেল রানার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন স্বপ্না। সোহেলও তাকে অভয় দিয়ে বলেন চিন্তা না করতে।
এরপর কাঠগড়ায় দাড়িয়ে সোহেল উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কেটেছি। ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন। আমি পাপ করেছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেন।’
এসময় সোহেল আরও বলেন, মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে দুই লাখ টাকা দেয়ার কথা বলেন। এরপর পুলিশ সদস্যরা তাকে থামিয়ে দেন। পরে ১১টা ৪৯ মিনিটে আসামি সোহেলকে কাঠগড়া থেকে নামিয়ে প্রিজন ভ্যানে নেয়া হয়।
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন। সাক্ষ্যগ্রহণ করার জন্য আগামীকাল ধার্য করেছেন। পুলিশের দেয়া প্রতিবেদনে ডলার নামে কেউ নেই। আসামি যদি এমন কিছু দাবি করে থাকে সেটা সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে আসতে পারে। এটা ম্যাটার অফ ট্রায়াল।
তিনি আরও জানান, দ্রুত সময়ে এ মামলা নিষ্পত্তি হবে। আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এর আগে গত ২৪ মে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য এদিন ধার্য করেন।
ওইদিন দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান ঘাতক সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট জমা দেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত চার্জশিট গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য বদলির আদেশ দেন।
মামলার সূত্রে জানা যায়, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে রুমের ভেতরে নেয়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা। একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি। ডাকাডাকির পর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান। জাতীয় জরুরী সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়নগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয় পুলিশ।
এ ঘটনায় বুধবার ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন।
এ মামলায় গত বুধবার (২০ মে) গ্রেপ্তার আসামি সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনার আগে ইয়াবা সেবন করেছিলেন বলে জবানবন্দিতে জানান এই ঘাতক।
জবানবন্দিতে সোহেল জানায়, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে ছোট্ট রামিসাকে ধর্ষণ করে সোহেল। এতে জ্ঞান হারায় শিশুটি। এর মধ্যে তার মা দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। এসময় সোহেল তাকে গলা কেটে হত্যা করে। মরদেহ গুম করার জন্য তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে গলা থেকে আলাদা করে। দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে। এছাড়া ছুরি দিয়ে যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিলেন। পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সে। মাদক সেবন করে বিকৃত যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া এই আসামি আদালতকে জানান, ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম