ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মুদ্রানীতি প্রভাবিত করার প্রবণতার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হলে তা মার্কিন অর্থনীতি ও জনআস্থার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রোববার বোস্টনে এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে পাওয়েল বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো ফেডারেল রিজার্ভও একটি ‘স্ট্রেস টেস্ট’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, মার্কিন কংগ্রেস অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক চাপ থেকে আলাদা রাখার ব্যবস্থা করেছে এবং বিশ্বের প্রায় সব উন্নত দেশেই মুদ্রানীতির স্বাধীনতা রক্ষার এমন নীতি প্রচলিত রয়েছে।
জন এফ কেনেডি ‘প্রোফাইল ইন কারেজ’ পুরস্কার গ্রহণের পর দেওয়া বক্তব্যে পাওয়েল বলেন, এই সুরক্ষাব্যবস্থা জনগণের স্বার্থে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এবং উভয় রাজনৈতিক দলের প্রশাসনই সাধারণত এগুলোকে সম্মান করেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি কোনও প্রশাসন নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে ফেড কর্মকর্তাদের অপসারণের পথ খোঁজে, তাহলে ভবিষ্যতের প্রশাসনও একই পথ অনুসরণ করবে।
তার মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মানুষ বিশ্বাস হারাবে যে, ফেড কেবলমাত্র দেশের সর্বোত্তম স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
পাওয়েল বলেন, সেই বিশ্বাসযোগ্যতাই ফেডকে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অর্থনীতি বজায় রাখতে সহায়তা করে, যা মার্কিন পরিবার ও ব্যবসার জন্য উপকারী।
তিনি আরও যোগ করেন, আমাদের এই বিশ্বাসযোগ্যতা বহু দশকের পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই অমূল্য সম্পদ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।
ফেড চেয়ারম্যানের পদ থেকে গত মাসে সরে দাঁড়ানোর পরও বোর্ড অব গভর্নরসের সাত সদস্যের একজন হিসেবে দায়িত্বে থাকা পাওয়েল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব নিয়েও বিস্তৃত বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, দলীয় রাজনৈতিক মতপার্থক্য একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য স্বাভাবিক এবং অপরিহার্য। তবে আমাদের অবশ্যই সেই উচ্চতর নীতিগুলোর প্রতি একতাবদ্ধ থাকতে হবে, যা আমাদের জাতিকে সংজ্ঞায়িত করে।
তিনি আরও বলেন,সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা। জন অ্যাডামস যেমন বলেছেন, এটি ‘মানুষের নয়, আইনের শাসন দ্বারা পরিচালিত সরকার’। আমাদের জন-প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবর্তনের মধ্যেও আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায় এবং স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জনকল্যাণের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারকে ধারণ করে।
যদিও পাওয়েল সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেননি, তবে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ফেডের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছেন বলে জানা যায়। বিশেষ করে সুদের হার আরও দ্রুত কমানোর দাবিকে কেন্দ্র করে এই চাপ বাড়ে।
ট্রাম্প তার মেয়াদকালে একাধিকবার পাওয়েলকে অপসারণের হুমকি দেন। একই সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী জিনিন পিরো ফেড চেয়ারম্যানের কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্য এবং ফেড সদর দফতরের সংস্কার কাজ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ফৌজদারি তদন্তও শুরু করেছিলেন।
এছাড়া ট্রাম্প ফেড গভর্নর লিসা কুককে মর্টগেজ জালিয়াতির অভিযোগে অপসারণের নির্দেশ দেন, যদিও অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়নি। পরে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট তাকে সাময়িকভাবে পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেন, যতক্ষণ না মামলাটি নিষ্পত্তি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ আইন অনুযায়ী, কোনও গভর্নরকে অপসারণ করতে হলে প্রেসিডেন্টকে ‘কারণ’ দেখাতে হয়, যা সাধারণত গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
উল্লেখ্য, জন এফ কেনেডি ‘প্রোফাইল ইন কারেজ’ পুরস্কারটি ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি জনসেবায় ব্যক্তিগত বা পেশাগত ঝুঁকি উপেক্ষা করে সাহসী ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে প্রদান করা হয়। অতীতে এই পুরস্কার পেয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ইউক্রেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইউশচেঙ্কো এবং জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান।
সূত্র: আল জাজিরা
রিপোর্টার্স২৪/এম এইচ