খাদেমুল বাবুল, জামালপুর: জামালপুরের ইসলামপুর সরকারি কলেজে বিধিবহির্ভূতভাবে বিএনপির পদধারী এক শিক্ষককে 'ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ' পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৮ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি কলেজ-৬ শাখার দায়িত্বে থাকা সিনিয়র সহকারী সচিব মনজুরুল আলম স্বাক্ষরিত এক আদেশে ১৯ মে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন ভূগোল বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ নূরে আলম মনি। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি এবং ব্যবসায়ী।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরিকালীন কোনো শিক্ষক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা আইন পরিপন্থী। এ সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলের পদধারী ও কনিষ্ঠ ওই শিক্ষককে সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রথম জ্যেষ্ঠ প্রভাষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়ার বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের কাছে ভুয়া তথ্য উপস্থাপন করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ নিয়েছেন নূরে আলম মনি। এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও শিক্ষক-কর্মচারীদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
তাঁদের দাবি, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হোক। এ ছাড়া বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার) থেকে নিয়োগ দেওয়া হলে আপত্তি থাকবে না।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ এপ্রিল কলেজের উপাধ্যক্ষ এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. আহাম্মদ আলীকে জামায়াত-শিবির ট্যাগ দিয়ে অন্যত্র বদলি করান নূরে আলম মনি। এতে শূন্য হয় উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষের পদ। একই দিন জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মো. রুকন উদ্দিনের কাছে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন অধ্যাপক আহাম্মদ আলী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আহাম্মদ আলী স্বাক্ষরিত নন-ক্যাডার শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণী তালিকায় কলেজটিতে ২৪ জন প্রভাষকের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার ১৩ নম্বর ক্রমিকে রয়েছেন নূরে আলম মনি। অধ্যাপক আহাম্মদ আলী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দিন ২৬ এপ্রিল প্রভাব খাটিয়ে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে প্রভাষক রুকন উদ্দিনকে দিয়ে প্রথম পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রভাষকের নামের মধ্যে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য আবেদন পাঠান নূরে আলম মনি।
এতে দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ প্রভাষকের তালিকায় থাকা মাহমুদা সুলতানাকে চতুর্থ নম্বরে, তৃতীয় জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মো. মোরাদুজ্জামানকে দ্বিতীয় নম্বরে এবং ষষ্ঠ জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মিনাক্ষী প্রসাদ সাহাকে তৃতীয় নম্বরে রাখা হয়। এতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের বিষয়টি নজরে আসায় ১২ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি কলেজ-৬ দেখভালের দায়িত্বে থাকা উপসচিব কাজী নূরুল ইসলাম প্রভাষক নূরে আলম মনির জ্যেষ্ঠতার সঠিক ক্রম নির্ধারণ করে সুস্পষ্ট মতামত প্রেরণের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দেন।
ওই চিঠির প্রেক্ষিতে ১৮ মে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কলেজ-১ শাখার সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিউল বশর কলেজ অধ্যক্ষকে শোকজ করেন এবং আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে নূরে আলম মনির জ্যেষ্ঠতার ক্রমিকের অমিলের কারণ ব্যাখ্যাসহ সঠিক ক্রম নির্ধারণ করে সুস্পষ্ট মতামত এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের স্বাক্ষরসহ মতামত দিতে বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও শোকজের নোটিশ কলেজে না পৌঁছানোর দাবি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের।
জ্যেষ্ঠতার ৭ নম্বর ক্রমিকে থাকা প্রভাষক শেখ মো. রুহুল আমীন জীবন বলেন, 'জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে কীভাবে নূরে আলম ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নিয়োগ নিয়েছেন, সেটা বলতে পারছি না। তবে আমি অনাপত্তিপত্রে স্বাক্ষর দিইনি।'
জ্যেষ্ঠতার ৮ নম্বর ক্রমিকে থাকা প্রভাষক মোহাম্মদ আহসান হাবিব রাজা বলেন, 'জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হওয়ার পরও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ না নেওয়ার অনাপত্তিপত্রে স্বাক্ষর করিনি। বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।'
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নিয়োগ পাওয়া প্রভাষক মোহাম্মদ নূরে আলম মনি বলেন, 'আমার বিরুদ্ধে অযথা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী আমাকে নিয়োগ দিয়েছে। আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই।'
প্রভাষক রুকন উদ্দিন বলেন, 'আমাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে কাজ করায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন হয়েছিল। পরে ঠিক করা হয়েছে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনে শোকজের বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে শোনেছি। কিন্তু এখনো নোটিশ পাইনি।'
বিদায়ী অধ্যাপক ড. আহাম্মদ আলী বলেন, 'নিয়ম অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতার ১ নম্বরে থাকা প্রভাষক রুকন উদ্দিনের কাছে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছি। এখন শোনা যাচ্ছে, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন হয়েছে। কলেজটিকে ফুলের মতো সাজিয়ে রেখে এসেছি। এটা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব সেখানকার লোকজনের।'
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নবাব বলেন, 'নূরে আলম মনি উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি পদে রয়েছেন। শোনেছি, তাঁকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।'
রিপোর্টার্স২৪/এসএন