ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক প্রতিযোগিতামূলক ও স্কুল পরীক্ষায় ভয়াবহ জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি।
দিল্লির তীব্র তাপদাহ ও ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে সকাল থেকেই যন্তর মন্তরে জড়ো হতে থাকেন শত শত শিক্ষার্থী ও তরুণ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যন্তর মন্তর ও সংসদ মার্গ এলাকায় ১ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। ড্রোনের মাধ্যমে বিক্ষোভস্থলের ওপর নজরদারি চালায় দিল্লি পুলিশ। বিক্ষোভে আরও যোগ দেন বিশিষ্ট শিক্ষাসংস্কারক ও জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুক। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের জন্য ৫ই জুন পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া সময়সীমা পার হওয়ার পর তিনি আজ সরাসরি যন্তর মন্তরে এসে দিপকের এই আন্দোলনে সংহতি জানান।
‘আমাদের পোস্ট মুছতে পারবেন, আমাদের নয়’: আমেরিকার বোস্টন থেকে দিল্লি বিমানবন্দরে নেমেই অভিজিৎ দিপকে সাংবাদিকদের বলেন, “শিক্ষামন্ত্রীকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে। এই পরীক্ষা কেলেঙ্কারির কারণে ইতিমধ্যে পাঁচজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। পরে যন্তর মন্তরের সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে দিপকে সরকারের বিরুদ্ধে তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক ও পোস্ট মুছে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বন্ধুরা, এই লড়াই দীর্ঘ। আমরা এক মাস ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছি। কিন্তু এই নির্লজ্জ সরকার ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে আমাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করতে আর পোস্ট ডিলিট করতেই বেশি ব্যস্ত। আপনারা আমাদের পোস্ট মুছে দিতে পারেন, কিন্তু এই মাঠ থেকে আমাদের মুছে ফেলা যাবে না।
ককরোচ জনতা পার্টির উত্থান: চলতি বছরের মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) মন্তব্যের পরদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেবল একটি গুগল ফর্ম পোস্ট করে এই ব্যঙ্গাত্মক সংগঠনটির যাত্রা শুরু করেছিলেন ৩০ বছর বয়সী পিআর-এর ছাত্র অভিজিৎ দিপকে। ভারতের যুবসমাজের ক্ষোভ ও হতাশাকেন্দ্রীক এই দলটির ফলোয়ার সংখ্যা মাত্র কয়েকদিনেই ২ কোটি পার হয়ে যায়। কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকার দাবি করলেও অনেকেই এটিকে অতীতের ‘ইন্ডিয়া অ্যাগেইন্সট করাপশন’ আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করছেন। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে দিপকের পৈতৃক বাসভবনেও নিরাপত্তা জোরদার করেছে স্থানীয় পুলিশ। যেকোনো মূল্যে এই আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ ও অহিংস রাখার জন্য আন্দোলনকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সিজেপি প্রধান।
ভয় জয় করে রাজপথে ককরোচ জনতা পার্টি: বোস্টন ইউনিভার্সিটির স্নাতক অভিজিৎ দিপকে দিল্লি বিমানবন্দরে নামার আগে ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্টে লিখেছিলেন, আমার বন্ধুবান্ধব এবং পরিবার আশঙ্কায় ছিল যে আমি বিমানবন্দরেই গ্রেপ্তার হতে পারি। কিন্তু কতদিন আমরা জেলের ভয়ে মুখ বুজে থাকব? এই দেশ তো কেবল কোনো একটি দলের নয়, এই দেশ আমাদের সবার। এটি আমাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন, যা আজ ধ্বংসের মুখে। সকাল থেকেই দিল্লি বিমানবন্দরে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে পুলিশ। সেখান থেকে দিপকে এবং তার সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়। মাত্র এক সপ্তাহে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি ফলোয়ার পাওয়া এই সংগঠনটির এআই দিয়ে তৈরি তেলাপোকা মাসকটটি ইতিমধ্যে পুরো ভারতের সোশ্যাল মিডিয়া ও মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে ভাইরাল হয়ে উঠেছে।
আন্দোলনের নেপথ্যে ‘তেলাপোকা’ মন্তব্য ও পরীক্ষা জালিয়াতি: ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র জন্ম। তিনি ভুয়া ডিগ্রিধারী পেশাজীবীদের ইঙ্গিত করে ‘তেলাপোকা’ বললেও, দেশটির কোটি কোটি বেকার যুবক এটিকে নিজেদের প্রতি কটাক্ষ হিসেবে ধরে নেন এবং ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এই ঘটনার পরপরই ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ফলাফল বাতিল করা হলে যুবকদের সেই ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ফরেনসিক সায়েন্সের এক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ভেরোনিকা মদান (২৪) নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ভয়াবহ মানসিক চাপ কাজ করে আমাদের ওপর। কোনোভাবেই যেন পরিবারকে হতাশ না করি, সেই ভয় তাড়া করে বেড়ায়। আমরা প্রতিযোগিতার বিরোধী নই, আমরা শুধু একটি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু পরীক্ষা ব্যবস্থা চাই। একটি সমীক্ষা অনুসারে, ভারতে ২৫ বছর বা তার কম বয়সী গ্র্যাজুয়েটদের প্রায় ৪০ শতাংশই বর্তমানে বেকার, যা দেশের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার যুব আন্দোলন ও সরকারের ওপর চাপ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং এর পরের বছর নেপালে তরুণদের হাত ধরে ক্ষমতার রদবদল এর অন্যতম উদাহরণ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার গত এক দশকে নোট বাতিল, কৃষক আন্দোলন এবং কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মতো বড় বড় সংকটের মুখোমুখি হলেও নির্বাচনি মাঠে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে। তবে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা দিপকের মতে, পাঁচ বছর আগেও মোদি বা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস মানুষ পেত না, কিন্তু সময় এখন পাল্টাচ্ছে। ইতিমধ্যে এই ডিজিটাল আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং ম্যাককিনসের একজন সাবেক কর্মকর্তাকে দলের মুখপাত্র হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মুখপাত্র ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক সৌরভ দাস ভারতের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিম্নমুখী সূচক এবং মোদির একক সংবাদ সম্মেলন না করার বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আপনারা দেখছেন যে এই দেশে গত কয়েক বছর ধরে তেমন কোনো প্রেস কনফারেন্স হয় না। তবে আমরা সাংবাদিকদের সব প্রশ্নের জবাব দেব। ব্যবস্থায় যে পচন ধরেছে, তার জবাবদিহিতা আমাদের নিশ্চিত করতেই হবে। সূত্র: দ্যা হিন্দু, টাইমস অব ইন্ডিয়া, সিএনএন
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব