স্পোর্টস ডেস্ক: লিওনেল মেসির জাদুকরি পা, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর অ্যাক্রোবেটিক ফিনিশ, লামিনে ইয়ামালের উইং-ঝলক আর কিলিয়ান এমবাপ্পের দুর্দান্ত গতি..সব মিলিয়ে আরেকটি বিশ্বকাপের অপেক্ষা প্রায় শেষ। আগামী বৃহস্পতিবার, ১১ জুন পর্দা উঠবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া এই বিশ্ব আসরে দেখা যাবে ফুটবলের দারুণ সব কিংবদন্তিদের, সঙ্গে থাকবে নতুন প্রজন্মের উদীয়মান তারকারাও। সেখান থেকে টুর্নামেন্টে যারা নজর কাড়তে পারেন, এমন ১০ ফুটবলাররা হলেন:
লিওনেল মেসি, আর্জেন্টিনা
চার বছর আগে অধরা বিশ্বকাপ জিতে শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন লিওনেল মেসি। অসংখ্য শিরোপায় ভরা ক্যারিয়ারে সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন। এবার ৩৮ বছর বয়সে আবারও বিশ্বকাপ মঞ্চে ফিরছেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড। এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের মূল পর্বে তার যৌথ রেকর্ড ষষ্ঠ অংশগ্রহণ। কাতারে জেতা শিরোপা ধরে রাখার মিশনে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসাদের একজন থাকবেন তিনি।
আর্জেন্টিনা ফুটবলের হৃদস্পন্দন বলা হয় মেসিকে। তবে বয়স ও ফিটনেসের কারণে এবারের বিশ্বকাপে তার ভূমিকা কিছুটা সীমিত হতে পারে। তবু শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে তার উপস্থিতি আর্জেন্টিনার জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করবে।
লামিনে ইয়ামাল, স্পেন
বয়স মাত্র ১৮ হলেও লামিনে ইয়ামালের পরিণত ফুটবল অনেক বেশি অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত দেয়। নিজের প্রজন্মের অন্যতম সেরা এই উইঙ্গার ইতোমধ্যে বিশ্ব ফুটবলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন।
ইউরো ২০২৪ জয়ে স্পেনের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছেন ইয়ামাল। ভক্ত ও বিশ্লেষকদের আগ্রহ..বিশ্বমঞ্চে নতুন কী চমক দেখাবেন তিনি।
নিজের গতি, স্কিল ও গোল করার সামর্থ্য ধরে রাখতে পারলে ইয়ামাল হয়ে উঠতে পারেন টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত মুখ। এমনকি সর্বোচ্চ গোলদাতার গোল্ডেন বুট জেতা সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে তার সামনে।
কিলিয়ান এমবাপ্পে, ফ্রান্স
২০২২ বিশ্বকাপ ছিল কিলিয়ান এমবাপের জন্য মধুর-তিক্ত অভিজ্ঞতা। ফাইনালে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করেও টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার কাছে শিরোপা হাতছাড়া হয় ফ্রান্সের।
তবে সেই আসর থেকে ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নিয়েই ফিরেছিলেন এমবাপে। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট। প্রতিপক্ষদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, আক্রমণে তিনি কতটা ভয়ংকর।
আরও অভিজ্ঞ হয়ে এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে নামবেন ফরাসি তারকা। লক্ষ্য থাকবে পরিষ্কার; আরেকবার বিশ্বকাপ জেতা। পাশাপাশি ব্যক্তিগত এক মাইলফলকও তার সামনে। ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা অলিভিয়ের জিরুর ৫৭ গোলের রেকর্ড ছুঁতে এমবাপের প্রয়োজন মাত্র একটি গোল। জিরু ৩৬ বছর বয়সে সেই কীর্তি গড়েছিলেন, এমবাপে সেটি করতে পারেন ২৭ বছর বয়সেই।
আর্লিং হালান্ড, নরওয়ে
ইউরোপিয়ান ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছেন। নরওয়ের প্রতিশ্রুতিশীল ‘গোল্ডেন জেনারেশন’-এর নেতৃত্বে থাকবেন ম্যানচেস্টার সিটির এই ফরোয়ার্ড।
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ছিলেন দুর্দান্ত। উয়েফা অঞ্চলের বাছাইপর্বে ১৬ গোল করে হয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। তার কাছাকাছি থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় সংখ্যাটি দ্বিগুণেরও বেশি।
গত অক্টোবরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫০ ম্যাচের কম খেলেই ৫০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন হালান্ড। ফুটবল ইতিহাসে তিনি মাত্র ষষ্ঠ খেলোয়াড়, আর গত ৫৩ বছরে প্রথম, যিনি এই কীর্তি গড়েছেন। ২৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারের জন্য ‘গোল মেশিন’ তকমাটি তাই যথার্থই।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, পর্তুগাল
২০২৬ বিশ্বকাপ হতে পারে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ। ৪১ বছর বয়সে ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে থাকলেও অসাধারণ ফিটনেস ধরে রেখে এখনও নিজেকে আলাদা উচ্চতায় রাখছেন পর্তুগিজ তারকা।
পর্তুগালকে ইউরোপিয়ান সাফল্য এনে দেওয়ার পর এবার বিশ্বমঞ্চেও একই স্বপ্ন পূরণ করতে চাইবেন রোনালদো। ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জেতার সুযোগ হয়তো এটিই তার শেষ বড় মঞ্চ।
কাতার বিশ্বকাপে তৎকালীন কোচ ফের্নান্দো সান্তোসের সঙ্গে দূরত্বের কারণে খুব বেশি সময় পাননি রোনালদো। তবে রবার্তো মার্তিনেসের অধীনে এবার বেশি মিনিট পাওয়ার সম্ভাবনা আছে তার। বিশ্বকাপে নিজের সেরা গোলসংখ্যা চার। এবার সেটি ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও থাকবে পর্তুগিজ অধিনায়কের।
হ্যারি কেইন, ইংল্যান্ড
বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে টানা দ্বিতীয় বুন্দেসলিগা শিরোপা জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে বিশ্বকাপে যাচ্ছেন হ্যারি কেইন। ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মগুলোর একটিতে থাকা ইংল্যান্ড অধিনায়ক হতে পারেন থ্রি লায়ন্সদের আক্রমণের প্রধান অস্ত্র।
টানা দুই মৌসুমে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন কেইন। বিশ্বকাপের আগে অন্যতম ফেবারিট হিসেবে বিবেচিত ইংল্যান্ডের আক্রমণে তার গোলক্ষমতা বাড়তি শক্তি যোগ করবে।
২০১৮ বিশ্বকাপে ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন কেইন। এবারও সেই পুরস্কারের অন্যতম দাবিদার হিসেবে নামবেন তিনি। যদি আবারও গোল্ডেন বুট জিততে পারেন, তাহলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে দুবার এই পুরস্কার জয়ের কীর্তি গড়বেন ইংলিশ স্ট্রাইকার।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ব্রাজিল
চার বছরে একজন ফুটবলারের অবস্থান কতটা বদলে যেতে পারে, তার বড় উদাহরণ ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলে তিনি তখন মাত্র জায়গা করে নিয়েছেন। এবার বিশ্বকাপে তিনি যাচ্ছেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে।
শিরোপা জয়ের ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার মিশনে ব্রাজিলের আক্রমণের অন্যতম প্রধান ভরসা থাকবেন ভিনিসিয়ুস। গতি, ড্রিবলিং ও টেকনিকের জন্য পরিচিত এই উইঙ্গার থাকবেন সেলেসাওদের তারকাসমৃদ্ধ আক্রমণভাগের কেন্দ্রে। ব্রাজিল দলে আছেন সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জুনিয়রও, যিনি চমক হিসেবে স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন।
কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ভিনিসিয়ুসের জন্য বাড়তি সুবিধাও আছে। রিয়াল মাদ্রিদে ইতালিয়ান কোচের অধীনেই দারুণ উন্নতি করেছিলেন তিনি। সেই পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিতে ২০২৪ সালে ‘দ্য বেস্ট ফিফা মেনস প্লেয়ার’ নির্বাচিত হন ভিনিসিয়ুস।
অঁতোয়ান সেমেনিয়ো, ঘানা
বছরের শুরুতে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার পর দ্রুতই নজর কেড়েছেন অঁতোয়ান সেমেনিয়ো। প্লেমেকিং সামর্থ্যের পাশাপাশি গোল করার ক্ষমতাও দেখিয়েছেন ২৬ বছর বয়সী এই উইঙ্গার।
সিটির শিরোপা লড়াইয়ে তার ১০ গোল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে মৌসুমটি তিনি বিশেষভাবে মনে রাখবেন অসাধারণ ব্যাক-হিল ফিনিশের জন্য, যেটি সিটিকে এনে দেয় অষ্টম এফএ কাপ শিরোপা।
বিশ্বকাপে সেই ফর্ম ধরে রাখতে পারলে ঘানার অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠতে পারেন সেমেনিয়ো। চোটের কারণে মিডফিল্ডার মোহাম্মদ কুদুস না থাকায় তার ওপর দায়িত্ব আরও বাড়বে। পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া ঘানা দলে সেমেনিয়োই হতে পারেন সবচেয়ে বড় ভরসা।
আরদা গুলের, তুরস্ক
দুই দশকের বেশি সময় পর আবারও বিশ্বকাপে ফিরছে তুরস্ক। ‘ক্রিসেন্ট স্টারস’দের ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশা অনেক, আর সেই প্রত্যাশার বড় অংশ জুড়ে থাকবেন তরুণ উইঙ্গার আরদা গুলের।
ইউরোপের অন্যতম সেরা তরুণ প্রতিভা হিসেবে ইতোমধ্যে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন গুলের। এবার তার সামনে পরের ধাপ..বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে নিজেকে ঘোষণা করা।
রিয়াল মাদ্রিদের এই আলোচিত তরুণ জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় টুর্নামেন্ট খেলতে যাচ্ছেন। তুরস্কের সম্ভাবনাময় স্কোয়াডে তাকে ঘিরেই থাকবে সবচেয়ে বেশি নজর।
মোহাম্মদ সালাহ, মিসর
আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম বড় আইকন মোহাম্মদ সালাহ। অসংখ্য ব্যক্তিগত রেকর্ড গড়েছেন, ক্লাব ফুটবলে প্রায় সব বড় শিরোপাই জিতেছেন। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে এখনো বড় কোনো শিরোপা জেতা হয়নি ৩৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের।
মাংসপেশির চোট একসময় তার বিশ্বকাপ অভিযান নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছিল। তবে মিসর সমর্থকদের স্বস্তি, ‘ইজিপশিয়ান কিং’ উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।
সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ মঞ্চে অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে চাইবেন সালাহ। মিসরের আশা-ভরসার বড় অংশ তাই থাকবে তার কাঁধেই।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব