স্পোর্টস ডেস্ক: মাঠে বসে প্রিয় দলের খেলা দেখা, গ্যালারি কাঁপিয়ে গলা ফাটানো; যেকোনো ফুটবল ভক্তের জন্যই এটি এক পরম আরাধ্য মুহূর্ত। ইরাকের আবদুল্লাহ আদনানের জন্যও স্বপ্নটা ঠিক এমনই ছিল।
গত মার্চের শেষে যখন ইরাক ফুটবল দল ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে, তখনই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ও ফিলাডেলফিয়াতে অনুষ্ঠিতব্য নরওয়ে ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নিজ দেশের ম্যাচের টিকিট কেটে ফেলে। ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম ইরাক বিশ্বকাপে খেলার টিকিট পাওয়ায় আদনানের আনন্দের সীমা ছিল না। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন এখন ফিকে হতে চলেছে শুধুমাত্র একটি ভিসার কারণে।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আদনান একাকী নন; এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া চার চতুর্থাংশের (এক-চতুর্থাংশেরও বেশি) দেশের ফুটবল ভক্তরাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা, কড়া বিধিনিষেধ কিংবা উচ্চ রিজেকশন হারের মুখোমুখি হচ্ছেন।
অবশ্য ইরাক ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নেই, তবে আদনানের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অপ্রত্যাশিত আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ইরাকে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাদের নিয়মিত কনস্যুলার সেবা স্থগিত করেছে।
মার্কিন নিয়ম অনুযায়ী ভিসার জন্য সশরীরে ইন্টারভিউ দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় ইরাকের ভেতরে বর্তমানে ইরাকি ভক্তদের ভিসা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই সংকট কাটাতে আদনান পার্শ্ববর্তী দেশ জর্ডানের মার্কিন দূতাবাসে ইন্টারভিউয়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলেও, জর্ডানের নাগরিক না হওয়ার অজুহাতে তাকে ভিসা দেওয়া হয়নি।
টিকিট এবং জর্ডান ভ্রমণ বাবদ ইতিমধ্যেই তার প্রায় ১ হাজার ৮০০ ডলার লোকসান হয়েছে। তুরস্ক গিয়ে চেষ্টা করার সুযোগ থাকলেও সেখানে দীর্ঘ সময় লাগবে বিধায় তিনি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ দেখার আশা ছেড়েই দিয়েছেন।
শুধু ইরাকই নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া নীতির কারণে হাইতি, ইরান, সেনেগাল এবং আইভরি কোস্টের মতো দেশের নাগরিকেরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সাধারণ ভিজিটর ভিসা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতিই ছিল অবৈধ অভিবাসী ঠেকাতে কড়া সীমান্ত নীতি। তবে ফুটবল ভক্তদের ক্ষেত্রে এই কঠোরতা ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
আইভরি কোস্টের ফুটবল ফ্যান অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা জুলিয়েন কুয়াদিও আদোনিস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি এক ধরনের বর্ণবাদ যা মুখে স্বীকার করা হচ্ছে না, কিন্তু প্রমাণ তো চোখের সামনেই। কোনো ইউরোপীয় দেশকে এই ধরনের বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হয়নি। তবে আফ্রিকার বেলায় কেন?’
ভিসা জটিলতার কারণে তাদের অ্যাসোসিয়েশন এবার দল পাঠানোর চেষ্টাই করেনি। আদোনিস মনে করেন, যে দেশ অন্য দেশের সমর্থকদের স্বাগত জানাতে পারে না, তাদের বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার থাকা উচিত নয়।
তুলনামূলক ধনী ৪২টি দেশের নাগরিকেরা অনলাইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাত্র ৪০ ডলার খরচ করে ভিসা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুবিধা পাচ্ছেন, যার মধ্যে কোনো আফ্রিকান দেশ নেই। অন্যদিকে সাধারণ ভক্তদের জন্য এই ভিসার আবেদন ফি ১৮৫ ডলার এবং তার ওপর ইন্টারভিউ তো রয়েছেই।
বিবিসি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের (অক্টোবর ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা ৪৮টি দেশের মধ্যে ১১টি দেশের নাগরিকদের ভিসা রিজেকশনের হার ৪০ শতাংশের বেশি।
এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ইকুয়েডর, মিশর, হাইতি, আলজেরিয়া, উজবেকিস্তান, কেপ ভার্দে, জর্ডান, ইরান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ঘানা এবং সেনেগাল। জর্ডানের ফ্যান অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান আবু কাস জানান, তিনি নিজে ৪২টিরও বেশি প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়েও আম্মানের মার্কিন দূতাবাস থেকে ভিসা পাননি। ক্ষুব্ধ কাস বলেন, ‘এই বিশ্বকাপ আমাদের মতো আরবদের জন্য নয়, এটা তাদের নিজস্ব আয়োজন।’
ম্যাসাচুসেটসের অভিবাসন বিষয়ক আইনজীবী সেলিন আতালাহ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘ভিসা ব্যবস্থাই হলো এই বিশ্বকাপের অদৃশ্য দ্বাররক্ষী। ফিফা টিকিট বিক্রি করতে পারে, কিন্তু মার্কিন সরকার ঠিক করে কে ভিসা পাবে এবং বর্ডার পুলিশ ঠিক করে কে শেষ পর্যন্ত দেশে ঢুকতে পারবে।’
সমালোচনার জবাবে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা বিশ্বের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এই বিশ্বকাপ সফল করতে প্রস্তুত এবং অধিকাংশ বিদেশী ভক্তেরই (কানাডা, মেক্সিকো কিংবা ৪২টি ভিসা-মুক্ত দেশের নাগরিক হওয়ায়) কোনো জটিলতা হচ্ছে না。 তবে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি আবেদন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা হচ্ছে। মূলত মার্কিন প্রশাসন ভিসা শেষ হওয়ার পরও থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসীদের সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
যৌথ আয়োজক হিসেবে মেক্সিকো এবং কানাডাতে কিছু ম্যাচ অনুষ্ঠিত হলেও ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ফাইনালসহ ৭৮টি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু কানাডা এবং মেক্সিকোর নিজস্ব কিছু কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে এবং আফ্রিকার ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মতো কারণে সেখানেও কিছু দেশের ভক্তরা সমস্যায় পড়ছেন।
সব মিলিয়ে ফুটবল যেখানে বিশ্বকে এক সুতোয় বাঁধার কথা, সেখানে ভিসা জটিলতার অদৃশ্য দেয়াল কোটি ভক্তের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব