।। এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া ।।
০১.
বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তজুড়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) ধারাবাহিক অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত কয়েক দিন ধরে দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ৮ থেকে ১০টি পৃথক সীমান্ত পয়েন্টে বিজিবির কঠোর নজরদারি ও অনমনীয় অবস্থানের মুখে বিএসএফের এসব অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তারপরও আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন বহির্ভূতভাবে পুশইন অব্যাহত রেখেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত।
সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে এমন ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়—এমন বার্তা বাংলাদেশ চিঠির মাধ্যমে দিলেও তা ভারতের পক্ষ থেকে আমলে নেওয়া হচ্ছে না। এছাড়াও বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে দফায় দফায় পতাকা বৈঠক হলেও চোরাপথে বা বিজিবির অগোচরে পুশইনের ঘটনা বেড়েই চলছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পুশইনের এসব ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যাদের পুশইন করা হচ্ছে, তারা আসলে কারা, কোন দেশের নাগরিক—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে ভারত নিজেদের আইন ও সংবিধানও বারবার লঙ্ঘন করছে। তাঁদের মতে, এই পুশইন বাংলাদেশকে চাপে রাখার একটি কৌশল। ভারত অতীতেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড করেছে এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আরও জোরালো আলোচনা এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। পাশাপাশি বাংলাদেশে বসবাসরত অবৈধ ভারতীয় নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
০২.
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ভারতের আচরণ বরাবরই আক্রমণাত্মক বলে অভিযোগ রয়েছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের নাগরিকদের গুলি করে বা নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে—এমন অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে সীমান্ত দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর ঘটনা, যা ‘পুশইন’ নামে পরিচিত।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, লালমনিরহাটের তিনটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে নারী–পুরুষসহ মোট ৩৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে বিজিবির শক্ত অবস্থানের কারণে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। গত শুক্রবার ভোরে হাতীবান্ধার বড়খাতা সীমান্তে ১১ জন, পাটগ্রামের পঁয়ষট্টিবাড়ী সীমান্তে ১০ জন এবং আদিতমারীর দিঘলটারি–দুর্গাপুর সীমান্তে ১২ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করে বিজিবি।
১৫ ও ৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কঠোর অবস্থান এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে তারা দিনভর শূন্যরেখায় অবস্থান করতে বাধ্য হয়। পরে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকালের মধ্যে বিভিন্ন দফায় ভারতের ১৫৭ ও ৯৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়ন তাদেরকে পিকআপ ভ্যানে তুলে ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে ফিরিয়ে নেয়।
বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে বিএসএফ ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করেছিল। তাঁদের মধ্যে ১২০ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। তবে গত মে মাস থেকে সীমান্তে আবারও পুশইনের চেষ্টা বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারতে কোনো বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে অবস্থান করলে, তিনি বাংলাদেশি বা অন্য দেশের নাগরিক হোন—ভারতীয় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ কোনো ধরনের অবৈধ পুশইন বা পুশব্যাকের পক্ষে নয়। এ কারণে সীমান্তে বিজিবিকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
০৩.
এক দেশের নাগরিক অন্য দেশে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করলে তাকে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে ফেরত পাঠানোর নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ভারত কোনো ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে জোরপূর্বক এসব মানুষকে বাংলাদেশে পুশইন করছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী।
সম্প্রতি সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে পুশইনের জন্য মানুষ জড়ো করা হচ্ছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে। অতীতে বড় ধরনের পুশইনের ঘটনা ঘটেছে ২০০২–০৩ সালের দিকে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকারের সময়। পরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘদিন এই প্রবণতা কমে আসে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আবারও পুশইনের ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
বিজিবির দাবি, পুশইনের শিকার অধিকাংশ ব্যক্তি দীর্ঘদিন ভারতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। কেউ কেউ ভারতীয় পুলিশের হাতে আটক হয়ে কারাভোগও করেছেন। অনেকে দাবি করছেন, তারা ভারতেরই নাগরিক। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়াই কেন তাদের বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি পরিকল্পিত চাপ সৃষ্টির কৌশল। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, আদালতের রায় ছাড়া কাউকে জোরপূর্বক সীমান্তে ঠেলে দেওয়া আইনবিরোধী।
গত মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত ৩৪৬ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে কয়েকজন রোহিঙ্গাও রয়েছেন।
০৪.
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন। ভারত যদি কোনো ব্যক্তিকে অবৈধ নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করে, তাহলে আদালতের মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু সীমান্ত সমস্যা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশলও হতে পারে। কেউ কেউ এটিকে উসকানিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক নতুন করে টানাপোড়েনের মুখে পড়তে পারে।
০৫.
ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’-এর সম্পাদক কিরীটি রায় বলেন, কোনো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে চিহ্নিত করতে হলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। আদালতের রায় ছাড়া কাউকে জোরপূর্বক সীমান্তে পাঠানো বেআইনি।তিনি বলেন, পুলিশ ও প্রসিকিউশন একইভাবে কাজ করলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে এই ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তারা কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি সমাধানের পাশাপাশি প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবির নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, পুশইনের মতো পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে তা ভবিষ্যতে একটি বড় মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। দুই দেশের স্বার্থেই এই ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা জরুরি।
[লেখক: কলাম লেখক, রাজনৈতিক কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক] ই-মেইল: gmbhuiyan@gmail.com