আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক পিয়ংইয়ং সফরকে বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে চীন ও উত্তর কোরিয়া। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে, একই সঙ্গে পিয়ংইয়ংকে নিজেদের প্রভাব বলয়ের আরও কাছাকাছি টেনে আনতে সক্ষম হয়েছে বেইজিং।
দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে উত্তর কোরিয়া শি জিনপিংকে ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানায়। সফরজুড়ে দুই দেশের মধ্যে গভীর সহযোগিতার বার্তা দেওয়া হলেও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে কোনো বিতর্কিত বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হয়নি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের কোরিয়া কর্মসূচির পরিচালক জেনি টাউন বলেন, কিম জং উন দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়াকে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তার মতে, চলতি বছরে বিদেশ সফরের মধ্যে শি জিনপিংয়ের প্রথম গন্তব্য হিসেবে পিয়ংইয়ংকে বেছে নেওয়া এবং আলোচনায় উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি স্থান না পাওয়া কিমের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক অর্জন।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ একটি সংবেদনশীল বিষয় ছিল। এবার সেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের চীন ও উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিশ্লেষক জেরেমি চ্যান বলেন, বেইজিং কার্যত উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়ার অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে। এতে পিয়ংইয়ংয়ের দৃষ্টিতে রাশিয়ার সঙ্গে চীনের অবস্থান প্রায় সমপর্যায়ে চলে এসেছে।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোরীয় উপদ্বীপ ইস্যুতে বেইজিংয়ের নীতি ও অবস্থান আগের মতোই স্থিতিশীল রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের সরকারি বিবরণে কিছু পার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে। উত্তর কোরিয়া সফরের জাঁকজমক ও সমমর্যাদার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলেও চীন বাণিজ্য, পর্যটন এবং আইন প্রয়োগে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
জেনি টাউনের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার পরও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার আগ্রহের একটি সীমা রয়েছে। তার ভাষায়, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কিম জং উনের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার মতো সম্পর্ক শি জিনপিংয়ের সঙ্গে গড়ে ওঠেনি। তবে কৌশলগত স্বার্থের কারণে দুই দেশ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
এদিকে সফরে তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের ‘ওয়ান চায়না’ নীতির প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানানো এবং সামরিক সহযোগিতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করাকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
উত্তর কোরিয়াবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘এনকে নিউজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চ্যাড ও’ক্যারল বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়াকে সহায়তার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যে দেখিয়েছে যে, বড় শক্তিগুলোর পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ফলে তাইওয়ান ইস্যুতে পিয়ংইয়ংয়ের অবস্থান এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সফরকে ঘিরে কিম জং উনের কন্যা জু অ্যায়ের উপস্থিতি নিয়েও পর্যবেক্ষকদের আগ্রহ ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন মহলে ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে তাকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে চীন ও উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো ছবিতেই তাকে দেখা যায়নি।
সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক বেঞ্জামিন হোর মতে, চীনের কূটনৈতিক প্রটোকলের কারণে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন কিশোরীর উপস্থিতি কিছুটা অস্বস্তিকর বিবেচিত হতে পারে।রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি