রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত আলোচিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের হওয়া তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার মধ্যে দুটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, আরেকটি রয়েছে যুক্তিতর্কের চূড়ান্ত ধাপে। প্রসিকিউশনের প্রত্যাশা, চলতি মাসের মধ্যেই এসব মামলার রায় ঘোষণা হতে পারে।
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন মামলার বিচারকাজ বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২–এ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে দায়ের করা দুটি মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে ট্রাইব্যুনাল-২–এ।
একটি মামলার একমাত্র আসামি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু। অন্য মামলায় আসামি করা হয়েছে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজনকে।
রায়ের অপেক্ষায় ইনু ও হানিফের মামলা
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমন করতে উসকানি, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্রসহ মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হন।
এসব অভিযোগ প্রমাণে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। দীর্ঘ শুনানি ও যুক্তিতর্ক শেষে গত ১৪ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।
একইভাবে গত ১০ জুন মাহবুবউল আলম হানিফসহ চার আসামির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাটিও রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
এই মামলার অন্য আসামিরা হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। চারজনই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পাশাপাশি উসকানি ও প্ররোচনাসহ মোট তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ প্রমাণে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১৯ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে রাষ্ট্রপক্ষ। গত ৭ জুন প্রসিকিউশন চার আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন করে। পরে পলাতক আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্সের আইনজীবী তাদের নির্দোষ দাবি করে যুক্তি উপস্থাপন করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় নিহত ছয়জন হলেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।
চূড়ান্ত পর্যায়ে রামপুরা হত্যা মামলা
অন্যদিকে রাজধানীর রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলাও বিচারিক নিষ্পত্তির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এ মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার রয়েছেন রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। অন্য আসামিরা হলেন খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান এবং সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। তারা বর্তমানে পলাতক।
গত ১০ জুন মামলাটিতে পুনরায় সাফাই সাক্ষ্য দেন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। তিনি আদালতে দাবি করেন, ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগও তোলেন।
তার পক্ষে আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন আদালতে দাবি করেন, ভুক্তভোগী আমির হোসেনকে নিচ থেকে গুলি করা হয়েছিল। এ বিষয়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতামত চেয়ে ট্রাইব্যুনালে আবেদনও করা হয়েছে।
সর্বশেষ ১১ জুন আসামিপক্ষের আরেক সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন নির্ধারণ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। যুক্তিতর্ক শেষ হলেই মামলার রায়ের দিন নির্ধারণ করা হবে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে পুলিশের গুলিতে আহত হন আমির হোসেন। একই ঘটনায় বনশ্রী এলাকায় নিহত হন নাদিম ও মায়া ইসলাম নামে আরও দুজন। এ ঘটনায় পুলিশের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করা হয়।
চলতি মাসেই রায়ের আশা প্রসিকিউশনের
ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্টদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে এই তিনটি মামলা সবচেয়ে অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এসব মামলার রায় ঘোষিত হলে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে তিনটি আলোচিত মামলার বিচারকাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তাই চলতি মাসেই এসব মামলার রায় আসতে পারে বলে রাষ্ট্রপক্ষ আশাবাদী।
তিনি বলেন, হাসানুল হক ইনু ও মাহবুবউল আলম হানিফের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের নির্দেশনায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে ছয়জন নিরীহ মানুষ নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলে সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে এসেছে।
রামপুরা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকার গুলি করার দায় স্বীকার করে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তার ভিডিও আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় ভিডিওটি সম্পাদিত বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি নয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সব মিলিয়ে মামলাটিও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি। (ঢাকাপোস্ট)
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম