আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ শিগগিরই প্রকাশ করা হবে এবং ওই সমঝোতা তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেবে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মঙ্গলবার ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, চুক্তির ভাষা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। তিনি জানান, কয়েক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক পরিবেশে পুরো চুক্তি প্রকাশ করা হবে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চুক্তির কাঠামোতে স্বাক্ষর হবে। অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ উপস্থিত থাকতে পারেন।
চূড়ান্ত চুক্তি এখনো অনিশ্চিত
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানোর লক্ষ্যেই অন্তর্বর্তী এই চুক্তি করা হয়েছে।
তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এই সমঝোতা সংঘাত বন্ধের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত চুক্তির রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বলেছেন, স্বাক্ষরিত স্মারকটি একটি "খুব সাধারণ নথি" এবং এর বিস্তারিত আগামী দুই দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।
পরবর্তী আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, শুক্রবার কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষরের পর সুইজারল্যান্ডে পরবর্তী ধাপের আলোচনা শুরু হবে। সেখানে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যতের মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।
তবে ইরানের আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়টি পরবর্তী আলোচনার এজেন্ডায় নেই বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প বলেন, "ইরান এই প্রক্রিয়া শেষ করতে চায়। তারা স্বাভাবিক ব্যবসায় ফিরতে চায় এবং দুই দেশের সম্পর্কও এখন স্বাভাবিক হয়েছে। তাই আমি মনে করি, আলোচনা দ্রুত এগোবে।"
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের সম্ভাবনা
মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, চূড়ান্ত চুক্তি হলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং বিদেশে জব্দ থাকা সম্পদ মুক্ত করার মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সুবিধা আসতে পারে।
এছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠনের সম্ভাবনাও রয়েছে। যুদ্ধের সময় এসব দেশ ইরানের হামলার শিকার হয়েছিল এবং তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব সুবিধা পেতে হলে ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করতে হবে।
অন্যদিকে, ইরান দাবি করছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা কখনোই করেনি এবং নতুন আলোচনায় অংশ নিতে সম্মত হয়ে তারা বড় কোনো ছাড় দেয়নি।
ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল
উভয় পক্ষই বলছে, শুক্রবার থেকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি আবারও উন্মুক্ত হবে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
তবে শিপিং খাতের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুরোপুরি ফিরতে সময় লাগবে। গ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ডায়াপ্লাউসের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথে মাইন পাতা থাকতে পারে এবং সেগুলো পরিষ্কার করতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা
চুক্তির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সংঘাত।
ইরান বলছে, লেবাননে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি এই চুক্তির অংশ। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান বজায় রাখবে এবং হিজবুল্লাহর হামলার জবাব দেওয়ার অধিকারও সংরক্ষণ করবে।
ট্রাম্প নিজেও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল পরিস্থিতি যেভাবে সামাল দিচ্ছে, তাতে তিনি "খুশি নন"।রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি