আশিস গুপ্ত : মাত্র দু’দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র এমন এক লাল রেখা অতিক্রম করল, যা এতদিন কেবল সম্ভাবনার স্তরে ছিল — তারা ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ চালাল। এই হামলা ছিল নজিরবিহীন এবং অজস্র ঝুঁকিপূর্ণ। সারা বিশ্বজুড়ে তখনই বাজতে শুরু করেছিল সতর্কতার ঘণ্টা।
কিন্তু যুদ্ধের এই ধাক্কার মধ্যেই এক অভাবনীয় মোড় দেখা গেল। প্রত্যাশিতভাবে ইরান প্রতিশোধ নিয়েছে, তবে একটি পরিচিত কৌশল অনুসরণ করেই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছে যে তারা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানবে, তবে মৃত্যু বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটাবে না।
এমন এক উত্তপ্ত মুহূর্তে কাতার, যাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডেই ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা হয়েছে, তারা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ঘুরে দাঁড়িয়ে হয়ে উঠেছে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার মধ্যস্থতাকারী। আর সেই চেষ্টার ফলেই বিশ্ববাসী শুনল এক নাটকীয় ঘোষণা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানালেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।
এই ঘোষণায় যেমন চমক, তেমনি রয়েছে এক গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস। ১২ দিন ধরে যুদ্ধে বিপর্যস্ত ইরান ও ইসরায়েলের সাধারণ মানুষদের জন্য এটি স্বস্তির সংবাদ, এবং শুধু এই দুই দেশের জন্য নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্য এবং তার বাইরেও, এক বিরাট উৎকণ্ঠার ভার যেন হঠাৎ হালকা হয়ে এল।
তবু, অনেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শান্তি, ভালোবাসা ও সমৃদ্ধির স্বপ্নময় কথায় পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছেন না। বাস্তবতা বলছে এটি হয়তো কেবলমাত্র যুদ্ধের প্রথম অধ্যায়ের অবসান, কিন্তু শান্তির শুরু নয়। ইরান ও ইসরায়েলের বহু পুরনো বৈরিতা এত সহজে মিটে যাওয়ার নয়।
ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বলেন, “যুদ্ধবিরতি এখন কার্যকর। আমি ইরান ও ইসরায়েল— উভয় পক্ষকে বলছি, দয়া করে এটি লঙ্ঘন করবেন না!” এরপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা মেনে নেয়, তবে সাফ জানিয়ে দেয় “যদি কেউ এটি লঙ্ঘন করে, তাহলে আমরা শক্ত প্রতিক্রিয়া জানাব।”
ইরান এর আগেই জানিয়েছিল, তারা কেবল তখনই হামলা থামাবে, যদি ইসরায়েলও একই কাজ করে। তবে যুদ্ধবিরতির আগের রাতেই উভয় পক্ষ থেকে হামলা হয়েছে।
ইসরায়েল দাবি করেছে, ইরানের রাতভর রকেট হামলায় তাদের চারজন নিহত হয়েছে। অন্যদিকে, তেহরান থেকে বিবিসি পার্সিয়ান-এর সংবাদদাতা জানিয়েছেন, তাদের শহরেও রাতভর বোমার শব্দে আকাশ কেঁপেছে। এক বাসিন্দা বলেন, “আমার মনে হচ্ছে আমি ভেতরে ভেতরে বিধ্বস্ত হয়ে গেছি।”
এই রাত্রিকালীন উত্তেজনার পেছনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেই বোমাবর্ষণ, যার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে প্রচণ্ড আঘাত হানা হয়। প্রতিশোধ হিসেবে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা চালায়। কাতার পরে জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সব ক্ষেপণাস্ত্রই মাঝপথেই ভূপাতিত করেছে।
এভাবেই যুদ্ধের ঝড় হঠাৎ থেমে গিয়ে এসেছে এক অস্থায়ী নিস্তব্ধতা। কেউ জানে না এটি কতদিন চলবে, কিংবা এর পরিণতিতে আসলেই কোনো স্থায়ী শান্তি আসবে কিনা। তবে আপাতত, আতঙ্কের থাবা থেকে রক্ষা পাওয়ার যে প্রশান্তি সেটিই এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে সবচেয়ে বড় সুখবর।
এই যুদ্ধবিরতির গল্প, একদিকে যেমন নাটকীয়, তেমনি বিপজ্জনক। কারণ, অনেকেরই ধারণা — এই বিরতি কেবল ‘পরবর্তী ঝড়ের আগে নিঃশ্বাস নেওয়ার বিরতি’। এক হঠাৎ যুদ্ধ আর এক আকস্মিক শান্তির মাঝে আটকে পড়েছে লক্ষ মানুষের জীবন, আশা এবং ভবিষ্যৎ।এখন দেখার পালা এই সাময়িক বিরতি কি এক দীর্ঘশ্বাসের মতো মিলিয়ে যাবে, নাকি সত্যিই কোনও টেকসই শান্তির দিগন্ত খুলে দেবে মধ্যপ্রাচ্যে?
রিপোর্টার্স২৪/আরএইচ