রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সন্তান রুমীকে হারিয়ে ব্যক্তিগত শোককে জাতীয় সংগ্রামে রূপ দিয়েছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আপসহীন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের বিবেকের প্রতীক। আজ (২৬ জুন) এই মহান ব্যক্তিত্বের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনের ইতিহাসে জাহানারা ইমামের নাম চিরস্মরণীয়। শহীদ সন্তান রুমীকে হারানোর বেদনা তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি; বরং সেই শোক থেকেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন ন্যায়বিচারের এক ঐতিহাসিক আন্দোলন। এ কারণেই তিনি শুধু একজন মা নন, সমগ্র জাতির ‘শহীদ জননী’ হিসেবে সম্মানিত।
১৯২৯ সালের ৩ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুরে জন্মগ্রহণ করেন জাহানারা ইমাম। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘জুড়ূ’। বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং মা সৈয়দা হামিদা বেগম।
বাবার চাকরির সুবাদে তৎকালীন পূর্ববাংলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৪৫ সালে কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৬৫ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ সম্পন্ন করেন।
শিক্ষকতা দিয়েই শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর দেশে ফিরে আবারও শিক্ষকতায় যোগ দেন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনে বয়ে আনে নির্মম ট্র্যাজেডি। বড় ছেলে, বীর মুক্তিযোদ্ধা রুমী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। একই সময়ে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করেন তাঁর স্বামী শরীফ ইমাম। স্বাধীনতার পর রুমীর সহযোদ্ধারা তাঁকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নিলে তিনি ‘শহীদ জননী’ নামে সর্বজনস্বীকৃত হয়ে ওঠেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি প্রতিদিনের ভয়, শোক, প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার স্বপ্ন দিনলিপিতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সেই দিনলিপিই পরে ‘একাত্তরের দিনগুলি’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়ে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এ ছাড়া তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘অন্য জীবন’, ‘বীরশ্রেষ্ঠ’, ‘জীবন মৃত্যু’, ‘চিরায়ত সাহিত্য’, ‘বুকের ভিতরে আগুন’, ‘নাটকের অবসান’, ‘দুই মেরু’, ‘নিঃসঙ্গ পাইন’, ‘নয় এ মধুর খেলা’, ‘ক্যানসারের সঙ্গে বসবাস’ এবং ‘প্রবাসের দিনলিপি’।
স্বাধীনতার পর দেশে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনের ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত হয়ে তিনি সরাসরি আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’র আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে গঠিত গণআদালত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে দেশব্যাপী গণআন্দোলনে পরিণত করে, যা পরবর্তী সময়ে বিচার প্রক্রিয়া শুরুর ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জীবনের শেষদিকে দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত হন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে তাঁর মরদেহ দেশে এনে রাজধানী ঢাকায় দাফন করা হয়।
আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে মুক্তিযুদ্ধের এই অকুতোভয় সৈনিককে। তাঁর আদর্শ, সাহস এবং ন্যায়বিচারের সংগ্রাম আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম