ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: কয়েক দিনের আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে একটি কাঠামোগত (ফ্রেমওয়ার্ক) চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে ইসরায়েল ও লেবানন। তবে উভয় পক্ষই এটিকে সংঘাত অবসানের চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
শুক্রবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা মোয়াওয়াদ এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লেইটার।
চুক্তি স্বাক্ষরের আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, আজ আমরা একটি কঠিন কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ নিলাম।
পরবর্তীতে দেওয়া এক বিবৃতিতে রুবিও জানান, চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ‘লেবাননের জন্য সামরিক সমন্বয় গ্রুপ’ গঠনের মাধ্যমে সহায়তা করবে। পাশাপাশি জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় করে অবিলম্বে ১০ কোটি ডলারের মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন।
এছাড়া লেবাননের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিদ্যমান মার্কিন বরাদ্দ থেকে আরও ৩ কোটি ডলারের সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান অব্যাহত রাখার সুযোগ চুক্তিতে রাখা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, লেবাননের সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে কিছু অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে এবং পরীক্ষামূলকভাবে দুটি এলাকায় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে। ইসরায়েল এসব এলাকাকে "নিরাপত্তা অঞ্চল" বা "বাফার জোন" হিসেবে বিবেচনা করে, যেখান থেকে উত্তর ইসরায়েলে সম্ভাব্য হিজবুল্লাহ হামলা প্রতিহত করার দাবি করে তারা।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে লেবাননের জনগণ সম্পূর্ণ মুক্ত ভূখণ্ডে ফিরে যেতে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করতে পারবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, লেবাননের সার্বভৌমত্বে অন্য কোনো পক্ষের অংশীদারিত্ব থাকবে না।
লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা মোয়াওয়াদও চুক্তিটিকে "প্রথম পদক্ষেপ" হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লেইটার বলেন, "ইরান বাইরে, হিজবুল্লাহ বাইরে এবং ইসরায়েল-লেবানন শান্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।"
গত ২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের কয়েকদিন পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালালে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। এর জবাবে ইসরায়েলের বিমান ও স্থল হামলায় লেবাননে চার হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে এই সংঘাতে ইসরায়েলের অন্তত ৩২ জন সেনা সদস্য এবং চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহ তাদের নিহত সদস্যদের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে কয়েক হাজার যোদ্ধা নিহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
চুক্তির পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। শুক্রবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত এলাকার কাছে সক্রিয় সাতজন হিজবুল্লাহ সদস্যকে তারা হত্যা করেছে। তবে এ দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটির সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া লেবাননের কর্তৃপক্ষ এই চুক্তি কার্যকর করতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, হিজবুল্লাহ তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে না এবং এ ধরনের যেকোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করবে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো দক্ষিণ লেবাননের মানসুরি শহরের বাসিন্দাদের এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দিয়ে লিফলেট ফেলেছে ইসরায়েলি বাহিনী। লেবাননের সামরিক সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি ইসরায়েল মানসুরিকে তাদের নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করেছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, ওই এলাকা বর্তমানে নিরাপত্তা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং সেখানে সেনা সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করছেন। বেসামরিক মানুষকে নিরাপত্তার স্বার্থে ওই এলাকায় না যাওয়ার জন্য স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি