বেনাপোল প্রতিনিধি : স্কুলের নাম বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। যশোরের বেনাপোল বন্দর ও কাস্টম হাউজের সামনে এর অবস্থান। দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দরের এই স্কুল থেকে পাস করা লাখ লাখ ছাত্র-ছাত্রী আজ সমাজের উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত। এলাকার অনেক রাজনীতিবিদ এই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। এমপিদের পছন্দের লোক স্কুল পরিচালনা কমিটিতে নাম লেখাতে ব্যস্ত ছিলেন। স্কুলের উন্নয়নে তাদের কোনো দায়িত্ব ছিল না। সে কারণে দীর্ঘ ৩০ বছরেও নির্মাণ করা হয়নি নতুন কোনো ভবন।
বর্তমানে বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। যে কোনো মুহূর্তে পরিত্যক্ত ভবন ধসে ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। ১৮৮৭ সালে বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার পর ১৯৬৫ সালে একটি ভবন নির্মাণ করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় কবি নজরুল ইসলাম ভবন। এর পর ১৯৯৬ সালে আরও একটি ভবন নির্মাণ করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় কবি জসিমউদ্দিন ভবন। বর্তমানে দুটি ভবনই পরিত্যক্ত। ১২ জন শিক্ষক ও ৩৫৭ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে চলছে এ বিদ্যালয়টি। প্রধান শিক্ষক পদটি খালি রয়েছে।
স্বনামধন্য এই বিদ্যাপীঠের পুরোনো দুটি ভবন ৬ মাস আগে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলার শিক্ষা অফিস কর্তৃপক্ষ পরিত্যক্ত ঘোষণা করার পর আজও নতুন কোনো বিকল্প ভবনের মুখ দেখেনি সেখানকার শিক্ষার্থীরা। ফলে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের সেই পরিত্যক্ত ভবনে ক্লাস করতে হয় ঝড়-বৃষ্টি, বর্ষা-বাদলের মধ্যে। আর পরিত্যক্ত ভবনে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় স্কুলের বারান্দায় ক্লাস করতে হচ্ছে। অন্য একটি ভবনের একটি কক্ষে অফিস ও শিক্ষকদের বসার কক্ষ এবং পাশের কক্ষে ও উপরে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম রয়েছে। জায়গা সংকটের কারণে বর্তমানে দুই শিফটে ক্লাস করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। প্রথম শিফটে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির এবং দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস করানো হচ্ছে।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। সরকার শিক্ষা খাতে সর্বাধিক আর্থিক সুবিধা দিয়ে থাকলেও দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলের প্রাথমিক শিক্ষা আজও অবহেলিত। ভাঙাচোরা স্কুলের নিচে বসেই শিক্ষা গ্রহণ করতে হচ্ছে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের জায়গার সংকুলান না হওয়ায় তারা স্কুলের বারান্দায় ক্লাস করছে। পরিত্যক্ত বিল্ডিং ভেঙে পড়ার ভয়ে এলাকার কয়েকজন বিদ্যানুরাগী বাঁশ আর টিনের চাল দিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম করার দায়িত্ব নিয়েছেন।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ৩০ বছরেও স্কুলের পাকা ভবন নির্মাণ হয়নি। ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কয়েকবার চিঠি দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যথাযথ উদ্যোগের অভাবে প্রতিষ্ঠার এত বছর পরও প্রতিষ্ঠানের জন্য পাকা ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ভবন না থাকার পাশাপাশি রয়েছে শ্রেণিকক্ষের সংকট।
বেনাপোলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিক্ষানুরাগী আলহাজ মতিয়ার রহমান জানান, স্কুলটির ভবন না থাকায় এখানে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এ স্কুলটির জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৪ তলা একটি ভবন প্রয়োজন। বিষয়টি স্থানীয় মাননীয় সংসদ সদস্য মহোদয়কে বলা হয়েছে।
বেনাপোলের ব্যবসায়ী ও শিক্ষানুরাগী আলহাজ হাবিবর রহমান হবি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে স্কুলের ভবন নির্মাণ প্রয়োজন। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আমরা নিজেরাই শিক্ষার্থীদের অবস্থা দেখে বাঁশ আর টিনের চাল দিয়ে কয়েকটি ক্লাসরুম করার দায়িত্ব নিয়েছি। খুব দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। স্কুলের পাশে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা বেদৌরা পারভীন জানান, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১২ জন শিক্ষক এবং সাড়ে ৩০০ শিক্ষার্থী আছে। এ জন্য ১০টি শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন, কিন্তু আছে মাত্র চারটি। শ্রেণিকক্ষের অভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিত্যক্ত ভবনে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে হয়েছে দীর্ঘদিন। যে কোনো মুহূর্তে পরিত্যক্ত ভবন ধসে ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। সে কারণে ঝুঁকি না নিয়ে স্কুলের বারান্দায় ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বারবার ভবনের জন্য তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও শিক্ষা অফিস থেকে আশ্বাস পাওয়া গেলেও বহু বছরেও ভবনের মুখ দেখা মেলেনি। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর মেধাতালিকায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা স্থান করে নেয়। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী কয়েকজন বাঁশ আর টিনের চাল দিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম করার দায়িত্ব নিয়েছেন। ক্লাসরুম তৈরি হলে কিছুটা কষ্ট লাঘব হবে।
শার্শা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রেহেনা বানু জানান, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলছিল। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি কয়েকবার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে স্কুল পরিদর্শন করেছি। শ্রেণিসংকটের কারণে স্কুলের বারান্দায় ক্লাস নেওয়ার জন্য শিক্ষকদের বলা হয়েছে। নতুন ভবনের জন্য ইতোমধ্যে সয়েল টেস্ট করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করার পরও কেন নতুন ভবনের বরাদ্দ আসছে না, তা আমাদের বোধগম্য নয়। বরাদ্দ এলেই নতুন ভবনের কাজ শুরু করা হবে।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন