রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত প্রায় ৫ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানির চাহিদা নির্বিঘ্নে পূরণের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশে ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল (গ্যাস অয়েল) এবং ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল।
এই চালান সরবরাহ করবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড। এ জন্য সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এই জ্বালানি তেল কিনবে। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব ইতোমধ্যে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশের চাহিদা বিবেচনায় সরকার সাধারণত প্রতি ছয় মাস অন্তর ডিজেল ও জেট ফুয়েলসহ প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল আমদানি করে। সেই ধারাবাহিকতায় জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসের সম্ভাব্য চাহিদা পূরণের জন্য বিপিসি একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরে তা সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন লাভ করে।
তিনি আরও জানান, প্রশাসনিক ছাড়পত্র ইতোমধ্যে বিপিসির কাছে পাঠানো হয়েছে। এখন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নোয়া (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড) দেওয়ার পর তেল সরবরাহ শুরু হবে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের জ্বালানি মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন, কৃষিকাজ, পরিবহন এবং বিমান চলাচলের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিপিসির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মো. মিজানুর রহমান বলেন, গত ১০ জুন সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আন্তর্জাতিক দরপত্রের অনুমোদন দেয় এবং ১৭ জুন অনুমোদনের চিঠি পাওয়া যায়। ইতোমধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নোয়া ইস্যু করা হয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তির পর দ্রুত তেল সরবরাহ শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ দিনের জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য এটি বাড়িয়ে ৯০ দিনে উন্নীত করা। এ লক্ষ্য পূরণে নিয়মিত বিরতিতে জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত থাকবে।
আর্থিক ব্যয় ও ডলারের হিসাব
গত ২৪ মে জ্বালানি বিভাগে পাঠানো বিপিসির প্রস্তাবে বলা হয়, জুন-আগস্ট সময়কালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল আমদানি করা হবে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দরপত্রে পরিমাণ কিছুটা কম-বেশি রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের ১৩ মে নির্ধারিত বিনিময় হার অনুযায়ী (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ২৫ পয়সা) এই আমদানিতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২ কোটি ২৫ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৬ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে প্রকৃত ব্যয় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
বিপিসির প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, এই আমদানির অর্থ সংস্থাটির নিজস্ব তহবিল এবং প্রয়োজনে ঋণ বা সরকারি সহায়তার মাধ্যমে জোগান দেওয়া হবে।
বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাড়ছে ব্যয়
বিপিসির প্রস্তাব অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে ট্রানজিট সময় ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধঝুঁকি বিবেচনায় বিমা প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে।
প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল। সে সময় ডিজেলের সর্বোচ্চ দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ১৭৮ দশমিক ৯১ ডলার। ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল তা বেড়ে রেকর্ড ২৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছায়। ফেব্রুয়ারিতে ডিজেলের গড় দাম ছিল ৮৫ দশমিক ৯৯৭ ডলার, যা এপ্রিলে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৭ দশমিক ৯০৪ ডলারে।
বিপিসির দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির মতে, বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার কারণে প্রিমিয়াম কিছুটা বাড়লেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে পাওয়া মূল্য বর্তমান বাস্তবতায় যৌক্তিক।
দেশে জ্বালানির ঘাটতি নেই
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই এবং প্রায় ৬০ দিনের চাহিদা পূরণের মতো মজুত রয়েছে। ডলার সংকটের মধ্যেও এলসি খোলায় অগ্রাধিকার দেওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা নেই।
এ বিষয়ে যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশের জ্বালানি সরবরাহ চেইনে কোনো ধরনের সংকট বা বাধার আশঙ্কা নেই।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা কার্যকর করা হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে এবং একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। শিল্প, কৃষি ও পরিবহন খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম