রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: কক্সবাজারে টানা ভারি বর্ষণে পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রাণ হারিয়েছেন ৮ জন। এছাড়া কক্সবাজার সদর ও পেকুয়ায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে কক্সবাজার সদরের দরিয়ানগর এলাকায় পাহাড়ধসে এক নারীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শিশুসহ চারজন আহত হয়েছেন।
এর আগে রোববার রাত ১টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮ জন এবং কক্সবাজার শহরে একজনের মৃত্যু হয়। এছাড়া পেকুয়ায় সোমবার দুপুরে পাহাড়ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকে। রাত দেড়টার দিকে পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে মাটির নিচে চাপা পড়ে পুরো ঘরটি।
খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা রাতভর উদ্ধার অভিযান চালান। পরে কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছরের শিশুসন্তান মোহাম্মদ আনাসের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার সময় ওই ঘরে পরিবারের ১০ সদস্য ঘুমিয়ে ছিলেন। তাদের মধ্যে সাতজন প্রাণে বেঁচে গেলেও সবাই গুরুতর আহত হয়েছেন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তিনজনের মরদেহ এবং দুজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
এরপর রাত ২টার দিকে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে ওই ক্যাম্পের মোহাম্মদ রশিদের ছেলে।
এর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-১১ ব্লকে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজন নিহত হন। তারা হলেন— আব্দুর রাজ্জাকের দুই মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩) এবং মোহাম্মদ রশিদের দুই ছেলে মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর নামে এক স্থানীয় বাসিন্দার মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খলিফা মুরা আলিম্যার ঝিরি এলাকায় সোমবার দুপুরে পাহাড়ধসে মারা যায় সাত বছরের শিশু মো. মিনহাজ উদ্দিন। সে একই এলাকার কলিম উল্লাহর ছেলে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান জানান, পাহাড়ধসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা নারী ও শিশুসহ ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস না করার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে পাহাড়ধসের আতঙ্কে দিন কাটছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের। তাদের অভিযোগ, বর্ষা এলেই পাহাড়ধসের ভয় নিয়ে বসবাস করতে হয়। ভারি বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।
শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্প নয়, কক্সবাজার সদর, রামু ও উখিয়ার বিভিন্ন পাহাড়ঘেরা এলাকায় প্রায় তিন লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন। টানা বৃষ্টিতে এসব এলাকায়ও ভূমিধসের আশঙ্কা বেড়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্পের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় ও কিছু রোহিঙ্গার অবৈধ পাহাড় কাটার কারণে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বারবার সতর্ক করা হলেও একটি অসাধু চক্র পাহাড় কাটা অব্যাহত রেখেছে।
তিনি বলেন, এটি শুধু দুর্ঘটনা নয়; বরং মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। অবৈধভাবে পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম