ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ও যৌন হয়রানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। একাধিক ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত আইডি থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ছবি, ভিডিও ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে আপত্তিকর পোস্ট ও ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কনটেন্ট মুহূর্তেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। পোস্টগুলোর মন্তব্যের ঘরে প্রকাশ্যে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, মানহানিকর ও অশ্লীল মন্তব্য করা হচ্ছে। এতে নারী শিক্ষার্থীদের সাইবার নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলতি বছরের ১৮ জুন থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মাত্র এক মাসে ‘আমাদের ত্রিশাল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ২৫টি পোস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পোস্টে প্রায় ৪ হাজার ৭৬৫টি প্রতিক্রিয়া এবং ৫০০টির বেশি মন্তব্য এসেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৫টি পোস্টে নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ও হয়রানিমূলক বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে অভিযোগ শুধু একটি পেজে সীমাবদ্ধ নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত আইডি, বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপ থেকেও একই ধরনের কনটেন্ট নিয়মিত ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরে সেগুলো বিভিন্ন ব্যবহারকারীর মাধ্যমে আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে সাইবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে নারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি সংঘবদ্ধ সাইবার হয়রানির চক্র। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারেও অনিরাপদ বোধ করছেন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন।
এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেন, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানো হলেও কয়েকদিন ধরে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং তাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। এতে তিনি মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় স্থানীয় থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজ ও আইডিগুলো শনাক্তের কাজ চলছে। সাইবার পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অবহিত করা হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, সাইবার বুলিংয়ের ঘটনায় প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেবে। আইসিটি সেল ও প্রক্টরিয়াল বডিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট পেজ ও গ্রুপগুলোর অ্যাডমিনদের পরিচয় যাচাই, বিতর্কিত পোস্ট অনুমোদনের কারণ অনুসন্ধান এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর তদারকি জোরদার করা হবে।
ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর আহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে থানার ডিউটি অফিসার আশরাফুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের সাইবার অপরাধ তদন্তে বিশেষায়িত ইউনিট, ডিবি, র্যাব বা সাইবার পুলিশের সম্পৃক্ততা বেশি কার্যকর।
ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী আহসান হাবীব বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুযায়ী যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে তথ্য, ছবি, ভিডিও বা এআই-নির্মিত কনটেন্ট প্রকাশ ও প্রচার দণ্ডনীয় অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এছাড়া দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায়ও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সচেতন মহল দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, আপত্তিকর কনটেন্ট অপসারণ এবং নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সাইবার পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।