স্পোর্টস ডেস্ক: বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় ধরনের এক ধাক্কা। লিঙ্গ নির্ধারণী পরীক্ষায় চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী ‘শরীরে পুরুষ হরমোনের আধিক্য থাকা’ প্রমাণিত হওয়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাথলেট জান্নাত বেগম এবং নৌবাহিনীর কবিতা রায়কে নারী অ্যাথলেট হিসেবে প্রতিযোগিতা থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন।
একইসঙ্গে তাদের অর্জিত জাতীয় রেকর্ড ও সব পদক বাতিল করে তা পরবর্তী স্থানাধিকারীদের বুঝিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী কমিটির দ্বিতীয় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরেই এই দুই অ্যাথলেটের শারীরিক গঠন ও হরমোনজনিত বিষয় নিয়ে কানাঘুষা চলছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের স্ব-স্ব সংস্থা (সেনা ও নৌ-বাহিনী) থেকে লিঙ্গ নির্ধারণের বিষয়ে অভিযোগ করা হলে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হয় ফেডারেশন।
গত ১০ সেপ্টেম্বর ৫ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড গঠন করে অ্যাথলেটদের শারীরিক পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ আট মাসের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে গত ১১ মে শেষ হয় এই কার্যক্রম এবং ১৬ মে ফেডারেশনের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় মেডিকেল বোর্ড।
মেডিকেল বোর্ডের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ বছর বয়সী জান্নাত বেগম এবং ১৯ বছর বয়সী কবিতা রায়ের শরীরে ‘৪৬ এক্সওয়াই ডিএসডি’ ধরা পড়েছে। সহজ কথায়, মাতৃগর্ভে ভ্রূণ অবস্থায় একটি শিশুর প্রজননতন্ত্র যেভাবে গঠিত হওয়ার কথা, জিনগত বা হরমোনজনিত কারণে তাতে স্বাভাবিকের চেয়ে ভিন্নতা তৈরি হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাকে ‘ডিএসডি’ বলা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী যা তাদের পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করে। বিজ্ঞ বোর্ডের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দুই অ্যাথলেটেরই ‘পেনোস্ক্রোটাল হাইপোস্পেডিয়াস’ রয়েছে এবং তাদের গোনাড বা জননগ্রন্থি ইনগুইনাল ক্যানেলে অবস্থিত। অর্থাৎ জিনগতভাবে পুরুষ হওয়ার কারণে তাদের পেটের ভেতরে পুরুষের জননগ্রন্থি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শারীরিক বিকাশের ভিন্নতার ফলে সেই জননগ্রন্থিগুলো নালি দিয়ে পুরোপুরি নিচে নামতে পারেনি। সেগুলো শরীরের বাইরে না এসে ওই ইনগুইনাল ক্যানেল বা কুঁচকির নালিতেই আটকে আছে।
ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিক্সের নিয়ম অনুযায়ী, নারী বিভাগে অংশ নিতে হলে একজন অ্যাথলেটের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা টানা ২৪ মাস ‘২.৫ এনএমওএল/এল’ এর নিচে থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু উভয় অ্যাথলেটই এই শর্ত পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। মেডিকেল পরীক্ষায় দেখা গেছে, জান্নাত বেগমের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ‘১৯.৬৬ এনএমওএল/এল’, যা নির্ধারিত সীমার প্রায় ৮ গুণ বেশি। অন্যদিকে কবিতা রায়ের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পাওয়া গেছে ‘১৬.৫০ এনএমওএল/এল’, যা নির্ধারিত সীমার সাড়ে ৬ গুণেরও বেশি।
এই সিদ্ধান্তের ফলে জান্নাত বেগমের জ্যাভলিন থ্রো ও ডিসকাস থ্রো ইভেন্টে গড়া ২টি নতুন জাতীয় রেকর্ডসহ মোট ৮টি স্বর্ণ, ১টি রৌপ্য ও ২টি ব্রোঞ্জ পদক বাতিল করা হয়েছে। একইসঙ্গে কবিতা রায়ের ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও ৪×১০০ মিটার রিলে ইভেন্টে অর্জিত ১টি স্বর্ণ, ১টি রৌপ্য ও ২টি ব্রোঞ্জ পদকও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
ফেডারেশন জানিয়েছে, বাতিল হওয়া এসব পদক এখন নিয়ম অনুযায়ী ওই ইভেন্টগুলোতে পরবর্তী স্থানে থাকা অ্যাথলেটদের মাঝে আইনানুযায়ী পুনঃবণ্টন করা হবে।
বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ক্রীড়াঙ্গনে বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সের সঠিক নিয়ম-নীতি অনুসরণ, স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশের অ্যাথলেটিক্স অঙ্গনে ভবিষ্যতের খেলোয়াড় বাছাই ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় আরও কঠোরতা আসার স্পষ্ট বার্তা দিল ফেডারেশন।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব