রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়িতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে জেলা গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়েছে। মামলাটির নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলী।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।
তিনি জানান, মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি সোমবার বিকেলে ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে মামলার প্রয়োজনীয় নথিপত্র নতুন তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিন্নাত আলীর কাছে হস্তান্তর করেন। পরে বিকেলেই দুই কর্মকর্তা নগরীর মাছুয়াপাড়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের বাড়িতে যান। সেখানে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি মামলার বিভিন্ন দিক ও ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি সম্পর্কে নতুন তদন্ত কর্মকর্তাকে বিস্তারিত ব্রিফ করেন আগের তদন্ত কর্মকর্তা।
ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের স্বার্থে পুলিশ পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও আসামিরা একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।
তদন্তের দায়িত্ব ডিবিতে হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে এখন হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ, ঘটনার ধারাবাহিকতা, আসামিদের ভূমিকা এবং হত্যার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি নাএসব বিষয় আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নিহত গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসর নেন। এর আগে নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। পরে মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে সেখানে দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়িটির নিচতলার কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। প্রায় দুই থেকে তিন বছর ধরে তিনি পরিবার নিয়ে ওই বাড়ির দোতলায় বসবাস করছিলেন।
অবসরের পর গণপতি চক্রবর্তী হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবেও রোগী দেখতেন বলে জানা গেছে।
গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে মাছুয়াপাড়ার ওই বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)-এর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। একই পরিবারের চার সদস্যকে এভাবে হত্যার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসক জানিয়েছেন, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, চারজনেরই শ্বাসরোধে মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া দু-একজনের মাথায় কিছুটা আগে সামান্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মুগ্ধ নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে এবং সিদ্ধার্থ একই এলাকার বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে।
রোববার দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রংপুর নগর পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, বাসার ছাদে মাদক সেবনের সময় গণপতি চক্রবর্তী ছাদে উঠে পড়লে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর একে একে তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকেও হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, গ্রেপ্তার দুই আসামির বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরে তাদের আদালতে হাজির করা হলে তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
এদিকে রোববার বিকেলে চারজনের ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই রাতেই সাড়ে ১০টার দিকে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
চার হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার ডিবিতে যাওয়ায় এখন হত্যার প্রকৃত কারণ, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং আসামিদের বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থল ও অন্যান্য আলামতের মিল রয়েছে কি না এসব বিষয় তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম