হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে জমির মালিকানা ও দখলকে কেন্দ্র করে এক বিধবা নারী ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে স্বজনদের বিরোধ চরমে উঠেছে। এ বিরোধের জেরে মামলা, পাল্টা অভিযোগ ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিরোধীয় জমিতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে উভয় পক্ষকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
ঘটনাটি উপজেলার ৭নং শাকুয়াই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের জৈনাটি মাইজপাড়া গ্রামের। ভুক্তভোগী হিসেবে দাবি করা বিধবা মোছা. কহিনূর বেগম (৪৯) বলেন, তাঁর স্বামী মৃত রফিকুল ইসলামের পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া প্রায় ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি নিয়ে ভাসুরের ছেলে মো. আব্দুল কাইয়ুম ওরফে বাবুলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। তাঁর দাবি, জমিটি দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের ভোগদখলে রয়েছে।
জমিতে গেলেই প্রাণনাশের হুমকিতে কহিনূর বেগমের অভিযোগ, স্বামীর মৃত্যুর পর দুই ছেলে এক কন্যাকে নিয়ে কষ্টে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। তাঁর বড় ছেলে কামরুল ইসলাম (৩০) পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ছোট ছেলে নিয়ামুল ইসলাম (২০) মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। পরিবারের সীমিত আয়ের কারণে জমিটুকু তাঁদের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন বলে দাবি করেন তিনি।
কহিনূরের ভাষ্য, বিরোধীয় জমিতে চাষাবাদের প্রস্তুতি নিতে গেলেই আব্দুল কাইয়ুম বাবুলের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাধে। একপর্যায়ে তাঁকে জমিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে বিরোধীয় জমিতে গেলে পানি ছাড়া গিল্লা খাবে এবং কেটে বস্তায় ভরে গাংঙ্গে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। এ ধরনের হুমকির পর তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে দাবি করেন কহিনূর।
হালুয়াঘাট থানায় দেওয়া কহিনূর বেগমের একটি লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ সকাল ১০টার দিকে জমিতে যাওয়া নিয়ে বিরোধের সময় আব্দুল কাইয়ুম তাঁকে মারধর ও প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসেন। তাঁর চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তাঁকে রক্ষা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, গত ২৮ জুন থানায় দেওয়া আরেক অভিযোগে কহিনূর দাবি করেন, আমন মৌসুমে জমিতে চাষাবাদের জন্য শ্রমিক ও ট্রাক্টর নিয়ে গেলে আব্দুল কাইয়ুম অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ তাঁদের হালচাষে বাধা দেন এবং জমি জোরপূর্বক দখলের হুমকি দেন।
বিরোধের কেন্দ্রে জমির মালিকানা ও দখল অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিরোধীয় জমির মধ্যে জৈনাটি মৌজার বিএস/বিআরএস খতিয়ানের বিভিন্ন দাগে প্রায় ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ এর কাতে ৪ শতাংশ জমিসহ আরও কিছু জমি রয়েছে। এসব জমির মালিকানা, উত্তরাধিকার ও দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। ফলে বিরোধটি শুধু জমিতে চাষাবাদ বা দখলকে কেন্দ্র করে নয় এর সঙ্গে জমির মালিকানা ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নও জড়িত। প্রকৃত মালিকানা ও বৈধ দখল কার তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিল, খতিয়ান, দাগ, উত্তরাধিকার এবং দখলের প্রমাণ যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
আব্দুল কাইয়ুমের মামলায় আদালতের ১৪৪ ধারার নোটিশ জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আব্দুল কাইয়ুম বাদী হয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ময়মনসিংহে কোট মোকদ্দমা নং-১০০৩/২০২৬ দায়ের করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জুলাই ২০২৬ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারায় নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশে বিরোধীয় ভূমিতে বর্তমান দখলকারীর দখল অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি উভয় পক্ষকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উভয় পক্ষকে জমিসংক্রান্ত কাগজপত্র, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণসহ আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে আরও বলা হয়েছে, বিরোধীয় জমিকে কেন্দ্র করে শান্তি-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে দায়ী পক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
স্থানীয় সালিশে হয়েছিল আপসের উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও জানা গেছে। শাকুয়াই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার ইউনুস আলী খান স্বাক্ষরিত একটি প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মো. আব্দুল কাইয়ুম ও মৃত রফিকুল ইসলামের পরিবারের মধ্যে জৈনাটি মৌজার ২১৩ ও ৪৬ নম্বর খতিয়ানের বিভিন্ন দাগের জমি নিয়ে প্রায় এক বছর আগে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
পরে উভয় পক্ষ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি আপস-মীমাংসা করা হয়েছিল বলে ওই প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীতে অসহায় বিধবা কহিনূর বেগম ও তার পরিবারকে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় পূর্বের মীমাংসার পরও জমি নিয়ে বিরোধটি আবারও প্রকাশ্যে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দিয়ে হয়রানি বিধবার পরিবারের কহিনূর বেগমের অভিযোগ, জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ও অভিযোগ এনে হয়রানি করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, স্বামীহারা একজন নারী ও তাঁর পরিবারের সীমিত আয়ের ওপর ধারাবাহিক মামলা-মোকদ্দমার চাপ তৈরি হওয়ায় তাঁরা আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপাকে পড়েছেন।
তবে হয়রানিমূলক মামলা নাকি জমির প্রকৃত বিরোধ থেকে সৃষ্ট আইনগত পদক্ষেপ তা কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে বলা যায় না। বিষয়টি আদালতের নথি, উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণযোগ্য। আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দুই পক্ষ বর্তমানে আদালতের ১৪৪ ধারার নির্দেশনা থাকায় বিরোধীয় জমিতে নতুন করে সংঘাত, দখল পরিবর্তন বা শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার মতো কোনো পদক্ষেপ থেকে উভয় পক্ষকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর আদালতে উভয় পক্ষের কাগজপত্র, সাক্ষ্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের পর বিরোধের পরবর্তী গতিপথ স্পষ্ট হতে পারে।
এ বিষয়ে আব্দুল কাইয়ুম ওরফে বাবুল বলেন, বিরোধীয় জমিটি গত প্রায় ৪০ বছর ধরে ৯ শতাংশ জমি অন্যদের দখলে ছিল। পরে আমি স্থানীয়ভাবে দরবার-সালিশের মাধ্যমে অন্যের দখল থেকে জমিটি উদ্ধার করি। বর্তমানে আমি তাঁদের ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি দিতে চাই, কিন্তু তাঁরা তা গ্রহণ করছেন না। তিনি আরও বলেন, পৈত্রিক জমির প্রকৃত মালিকানা ও দখল নিয়ে আমি আদালতে ১৪৪ ধারায় মামলা করেছি। আদালতের সিদ্ধান্ত ও রায় অনুযায়ী জমির মালিক যিনি হবেন, তিনিই জমির দখল নেবেন। আদালতের রায় আমি মেনে নেব।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব