ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: রোমহর্ষক ষড়যন্ত্রের পর্দা ফাঁস করার দাবি করেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। তাদের মতে, হোয়াইট হাউসের চত্বরে ঐতিহাসিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলাকালীন সময়ে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার ভয়ংকর পরিকল্পনা করেছিল একদল উগ্রপন্থী।
গত ১৪ জুন হোয়াইট হাউসের সাউথ লহ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৮০তম জন্মবার্ষিকী এবং দেশটির আড়াইশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছিল ‘ইউএফসি ফ্রিডম ২৫০’ শীর্ষক বিশেষ মিশ্র মার্শাল আর্ট ইভেন্ট। আর ঠিক এই জমজমাট আন্তর্জাতিক আয়োজনের দিনেই ঘটে যেতে পারত আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী এক ট্র্যাজেডি।
এফবিআইয়ের পরিচালক কাশ প্যাটেল জানিয়েছেন, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই নাশকতার ছক ভেস্তে দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দাদের সময়োপযোগী তৎপরতায় বিস্ফোরকভর্তি ড্রোন হামলা, স্নাইপার টিম এবং হোয়াইট হাউসের গেট জোর করে দখলের পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে নস্যাৎ করা হয়। তদন্তে জানা গেছে, হামলাকারীরা পরিকল্পনা করেছিল যে বিস্ফোরণ ঘটানো ড্রোন দিয়ে লড়াইয়ের ভেন্যুর আশপাশের ভবনগুলোকে টার্গেট করা হবে এবং আতঙ্কে মানুষ যখন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে, তখন স্নাইপার টিম দিয়ে সাধারণ ভিড়ের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হবে। ঠিক কতটা নৃশংস ও বর্বরোচিত ছিল সেই পরিকল্পনা, তা তাদের একটি গোপনীয় চ্যাট গ্রুপের মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট। যেখানে অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সঙ্গে লেখা হয়েছিল যে পরিস্থিতি হতে চলেছে এক রক্তক্ষয়ী উন্মত্ততা।
কীভাবে উন্মোচিত হলো এই ভয়ংকর ষড়যন্ত্র? মার্কিন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ওহাইওর এক তরুণের পরিবারের এক সদস্যের সর্তকতার কারণে বিষয়টি প্রথম পুলিশের নজরে আসে। ওই তরুণ ওয়াশিংটন ডিসিতে কোনো এক বড় ধরনের ক্ষতিকর ঘটনা ঘটানোর কথা বলাবলি করছিলেন, যা নিয়ে তার পরিবার গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এরপরই এফবিআই এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে তদন্তে নামে এবং ১৯ বছর বয়সী টাইসেন প্রপার নামের ওই তরুণসহ চক্রের অন্যান্যদের গ্রেপ্তার করে। পুলিশ যখন ওহাইওর ওই তরুণের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন দেখা যায় তিনি ও তার সহযোগীরা আগে থেকেই অস্ত্র, গুলি এবং বর্ম বা বডি আর্মারে সজ্জিত ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ওই তরুণ জানান যে অনলাইনে এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকা লোকজনকে তিনি বাস্তবে কখনো দেখেননি, এমনকি তাদের আসল নামও তার জানা ছিল না।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে আরও লোমহর্ষক সব তথ্য। এফবিআইয়ের মতে, টাইসেন প্রপারের ফোন তল্লাশি করে ‘হান্টার্স’ নামে একটি সিগন্যাল গ্রুপের সন্ধান মেলে, যেখানে প্রায় ১৯ জন সদস্য যুক্ত ছিল। টিকটক, টেলিগ্রাম এবং সিমপ্লেক্সের মতো বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপে ফেক বা ভুয়া নাম ব্যবহার করে দিনরাত এই নাশকতার ছক কষতো তারা। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ ছিল এই উগ্রপন্থীরা। ফেডারেল প্রসিকিউটররা ইতোমধ্যে ছয়টি রাজ্য থেকে আটজন পুরুষকে সন্ত্রাসবাদীদের বস্তুগত সহায়তা প্রদান এবং হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। এদের মধ্যে টাইসেন প্রপার হলো মামলার সবচেয়ে কমবয়সী আসামি। তবে অভিযুক্ত প্রত্যেকেই আদালতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।
এই ষড়যন্ত্রের লক্ষ্যবস্তু কারা ছিলেন, তা শুনলে যে কারোরই পিলে চমকে উঠবে। এফবিআইয়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ছাড়াও এই উগ্রপন্থীদের প্রধান টার্গেটে ছিলেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। চক্রের ৩০ বছর বয়সী সদস্য ড্যানিয়েল এস্করিজ এবং ৩১ বছর বয়সী আব্রাহাম আলভারেজের মতো উগ্রপন্থীরা চ্যাট গ্রুপে অস্ত্র ও বিস্ফোরক জোগাড় করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লব ঘটানো, যা কাঁপিয়ে দেবে গোটা যুক্তরাষ্ট্রকে। এমনকি গ্রেপ্তার হওয়ার পরেও অপর এক সদস্য চ্যাট গ্রুপে লিখেছিলেন যে পিছু হটার আর কোনো উপায় নেই, কারণ ব্রেক আগেই ফেল করা হয়েছে এবং ব্যর্থতা তাদের কাছে কোনো বিকল্প নয়।
তদন্তকারীরা আরও জানতে পেরেছেন যে চক্রের সদস্যরা মাত্র দুইবার বাস্তবে মুখোমুখি বৈঠক করেছিল, বাকি সময়টা পুরোটাই ডিজিটাল মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখতো। ওহাইওর তরুণ টাইসেন প্রপার ল্যান্ডস্কেপিংয়ের চাকরি ছেড়ে নিজের উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েশনের জমানো প্রায় তিন হাজার ডলার খরচ করে আমেরিকান পতাকার নকশা করা একটি সেমি-অটোমেটিক শটগান কিনেছিলেন। তার বেডরুম থেকে পুলিশ অসংখ্য রাজনীতিবিদ ও সেলিব্রিটির নাম সংবলিত একটি ডায়েরি উদ্ধার করেছে, যেখানে সরকারের বিরুদ্ধে চরম ষড়যন্ত্রের কাল্পনিক তত্ত্ব লেখা ছিল। এছাড়া স্নাইপার হিসেবে নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে নিশানা করার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ২১ বছর বয়সী চ্যান্ডলার স্ক্যাগসের ওপর।
হোয়াইট হাউসের কাছাকাছি সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটার ঘটনার পর এই বড় মাপের নাশকতার ছক ফাঁস হওয়া মার্কিন প্রশাসনকে আরও বেশি সতর্ক করে তুলেছে। বর্তমানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া চলছে এবং ফেডারেল আদালত পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ