ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: আল জাজিরায় প্রকাশিত এক কলামে অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক বিদ্যা কৃষ্ণ ভারতজুড়ে সাম্প্রতিক আন্দোলনের জেরে দিল্লির মসনদ থেকে নরেন্দ্র মোদির পতনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। কলামটির ছায়া-অনুবাদ এখানে তুলে ধরা হলো।
ভারতের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থী ও বিরোধী দলগুলোর আলাদা আলাদা ক্ষোভ এখন এক জায়গায় মিলিত হচ্ছে। তারা সরকারের জবাবদিহি ও ক্ষমতার ব্যবহারের হিসাব চাইছে। অক্টোবর মাসে এসব ছোট ছোট প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ ধীরে ধীরে বড় আন্দোলনের দাবানলে রূপ নিচ্ছে।
ভারতের ‘তেলাপোকা’—অর্থাৎ ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) সমর্থকেরা আবারও রাস্তায় নেমেছে। গান্ধীর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তারা অহিংস অসহযোগ কর্মসূচি পালন করছে। পরিবেশটা আবারও উৎসবমুখর, প্রচুর শিক্ষার্থী; মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে মিছিল করা নারীদের সারি, তরুণদের সঙ্গে হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে, আর স্লোগান উঠছে—‘জ্ঞানু, তোমার সময় শেষ, ভাই।’
অদ্ভুতভাবে, তারা ইতিমধ্যেই ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে অতীত কালের মানুষ হিসেবে উল্লেখ করছে। এরপর কী হবে—কোন ব্যবস্থা বা কোন ব্যক্তি দায়িত্ব নেবে—সে প্রশ্ন আপাতত স্থগিত। সেটা পরে দেখা যাবে। এখন আন্দোলনকারীদের একটিই কেন্দ্রীভূত দাবি, কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে। তাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষে ভোটার তালিকা প্রভাবিত করা হয়েছে।
দিল্লিতে নারীদের নিরাপত্তার দাবিতে তরুণী ও কুইয়ার শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নেমেছে। দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির আস্থা কুঞ্জ পার্কে তিন ব্যক্তি পুলিশ পরিচয়ে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে কথিতভাবে গণধর্ষণ করার পর এই আন্দোলন শুরু হয়। একই সময়ে মুম্বাইয়ে আইআইটি বোম্বের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাহিল ওয়াকোডের বাবা-মা অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে সাহিল আত্মহত্যা করে মারা যায়। তার বাবা-মা শিক্ষকদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছেন এবং গুরুতর জাতিভিত্তিক হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন।
পুনেতে মহারাষ্ট্র পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার্থীরাও রাস্তায় নেমেছে। পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ, স্বচ্ছতার অভাব এবং পরীক্ষার ফল প্রকাশ নিয়ে অনিশ্চয়তাসহ নানা বিষয়ে তারা কমিশনের চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করছে।
আর যারা রাস্তায় নেই—ভারতের বাকি মানুষ—তারা কম্পিউটার বা মোবাইলের পর্দার সঙ্গে যেন নাভিরজ্জুর মতো যুক্ত। কখনও আশাবাদ, কখনও হতাশা, কখনও সন্দেহ, আবার কখনও ক্ষোভ—এই পরস্পরবিরোধী আবেগের ঢেউয়ে তারা ভাসছে।
এই আকস্মিকভাবে একত্রিত হয়ে ওঠা উত্তাল প্রতিবাদগুলো কার্যত মোদি সরকারকে দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার এক ‘পিনসার মুভমেন্ট’-এর মধ্যে ফেলেছে। বিভিন্ন প্রতিবাদের এই পরস্পরকে ছেদ করা ঢেউ জাতীয় মানসিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিচ্ছিন্ন জেন-জি প্রজন্মকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একত্রিত করা, বিরোধী দলগুলোকে নতুন করে সক্রিয় করে জাতীয় শক্তি হিসেবে সামনে আনা এবং বিচ্ছিন্ন ক্ষোভগুলোকে একটি দৃশ্যমান, সমন্বিত আন্দোলনে রূপান্তরিত করা—সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা সরকার আর সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
তার ওপর কেন্দ্রীয় দিল্লি ও মুম্বাইয়ের কিছু অংশ কঠোর নিরাপত্তার আওতায় রয়েছে—গান্ধী জয়ন্তীর দিনেই। দৃশ্যত এটি পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলেছে। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, মোদি আর স্থিতিশীল শাসন নিশ্চিত করতে পারছেন না; তিনি এখন বৈধতার বদলে শক্তি ও ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখছেন—বিশেষ করে ক্ষমতা হারানোর এবং ক্ষমতা হারানোর পর আইনি জবাবদিহির আশঙ্কায়।
মোদির রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশে ক্ষমতার শ্রেণিবিন্যাসই নিজের বৈধতার যুক্তি বহন করেছে। তার রাজনৈতিক দর্শনের একটি মৌলিক ধারণা হলো—ভোটাররা তার জন্য কাজ করবে, উল্টোটা নয়। যখন তিনি জনপ্রিয় ছিলেন, তখন এই পদ্ধতি কাজ করেছে। তিনি মানুষকে এটিএমের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড় করাতে পেরেছেন; খাদ্য, অর্থ কিংবা যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক যুক্তি ছাড়াই দেশব্যাপী লকডাউন করতে পেরেছেন; কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করতে পেরেছেন এবং কৃষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাতে পেরেছেন।
যখন তিনি আর আগের মতো জনপ্রিয় ছিলেন না, তখন নির্বাচন কমিশনার—যিনি আজীবন দায়মুক্তির সুরক্ষায় আছেন—ব্যবস্থাকে তার দলের পক্ষে ঝুঁকিয়ে দিলে তিনি জনপ্রিয়তা ও জনপ্রিয় ম্যান্ডেট—দুটিকেই অপ্রয়োজনীয় বলে ধরে নিতে পেরেছিলেন।
কিন্তু এখন আর পরিণতিহীন ক্ষমতা ভোগ করার সেই সুযোগ নেই। তিন মেয়াদ ধরে তিনি জনপ্রিয় বৈধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ—দুইয়ের সম্মিলিত শক্তি ব্যবহার করেছেন। সেই যুগ শেষ হয়েছে—এমনটাই লেখাটির দাবি। ২০১৪ সালের মতো তার আর সেই জনসমর্থনের ম্যান্ডেট নেই, এবং গণমাধ্যম, সংসদ, নির্বাচন কমিশন কিংবা বিচারব্যবস্থার মতো কোনো প্রতিষ্ঠানই তার হয়ে পরিস্থিতির অভিঘাত সামাল দেওয়ার অবস্থায় নেই।
প্রতিবাদগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও তাদের অন্তর্নিহিত দাবি আশ্চর্যজনকভাবে একই: ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহি থাকতে হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার, আইআইটি বোম্বের উচ্চবর্ণের শিক্ষক এবং পুলিশের পরিচয় দেওয়া কথিত ‘ধর্ষকেরা’-সবাই একই ধরনের জবাবদিহির দাবির মুখে পড়ছেন।
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ- জুলাইয়ে সিজেপির প্রথম বিজয়, তার পর নরেন্দ্র মোদি নিজের কার্যালয়ে ফিরে যান, তাতে তার পুরোনো আত্মবিশ্বাসের কিছুটা যেন অনুপস্থিত ছিল। ইনস্টাগ্রামের রিল ও মিমের লাগাতার বিদ্রূপে মোদির আত্মবিশ্বাসের বিশাল বেলুন যেন হাজারো ছোট ক্ষতে ফুটো হয়ে যাচ্ছে।
ইতিহাস হয়তো একদিন উল্লেখ করবে যে তার শক্তিশালী শাসনব্যবস্থায় প্রথম ফাটল কোনো নির্বাচনী পরাজয়ের মাধ্যমে আসেনি; এসেছিল তখন, যখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশ্বাস করা বন্ধ করেছিল যে কিছুই করা সম্ভব নয়।
এই নতুন প্রতিবাদের ঢেউ—তিন মাসের মধ্যে দ্বিতীয়টি—মোদির অপরাজেয়তার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
দেশজুড়ে এই প্রতিবাদ অক্টোবরজুড়ে চলবে। ‘তেলাপোকা’দের পাশাপাশি ভারতের বিরোধী দলগুলোও দেশজুড়ে পাঁচটি বড় সমাবেশ করবে। কুমারের পদত্যাগের দাবির পাশাপাশি তারা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)-এর পরিবর্তে ব্যালট পেপারে ফিরে যাওয়ার দাবি জানাচ্ছে। তাদের যুক্তি, ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থায় ভোট রেকর্ড ও গণনার ক্ষেত্রে কারচুপির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে মোদির নিজের ক্ষমতায় কোনো দেওয়ারই পরিকল্পনা নেই। তিনি দিনের শুরু করেন গান্ধীর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে। অথচ একই সময়ে দিল্লি ও মুম্বাইয়ে আন্দোলনকারীদের জমায়েত ঠেকাতে আধাসামরিক বাহিনীর ব্যারিকেড ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যান মোতায়েন করা হয়। নয়াদিল্লির নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়া রাস্তাগুলো ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যারা এই অবরোধ পেরিয়ে যেতে পেরেছে, তাদের কয়েকজনকে পুলিশ আটক করেছে।
বৈপরীত্যটি এতটাই স্পষ্ট যে একে কাকতালীয় মনে করা কঠিন। শুক্রবার ব্যাপক আটক করা হয়েছে। শনিবারও নতুন করে আটক করা হয়েছে। কিন্তু বারবার আটক হওয়ার পরও আন্দোলনকারীরা আবার প্রতিবাদস্থলে ফিরে আসছে এবং নিজেদের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে।
গান্ধী তার রাজনৈতিক জীবনে যেগুলোর বিরোধীতা করেছিলেন প্রকৃতপক্ষে মোদি সেই দমনমূলক ব্যবস্থাগুলো আবার সক্রিয় করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে জনসমাবেশে বিধিনিষেধ, কারফিউ, প্রতিরোধমূলক আটক এবং ভিন্নমত দমন। তার ক্ষমতার ভিত্তি যত অনিশ্চিত হচ্ছে, ততই তিনি নগ্নভাবে শক্তির ওপর নির্ভর করছেন।
গান্ধীর শিক্ষা যদি কিছু হয়ে থাকে, তা হলো—ক্ষমতা ও শক্তির সীমা আছে।
আগামী দিনগুলোতে মোদি হয়তো রাস্তাগুলো খালি করতে, আন্দোলনকারীদের কারাগারে পাঠাতে, পোস্টার বাজেয়াপ্ত করতে এবং ভিন্নমতকে স্তব্ধ করতে সফল হতে পারেন। কিন্তু অন্তত অনির্দিষ্টকাল ধরে তিনি ভারতীয় ভোটারদের এটা বিশ্বাস করাতে পারবেন না যে কোনো ক্ষমতা শুধু শক্তিশালী বলেই বৈধ।
ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার ভারে ক্ষয়ে যাচ্ছে, গণতন্ত্রে এখন ক্লান্ত। লাখো ভারতীয়র ছোট ছোট বিদ্রোহে উঠে দাঁড়ানোর দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি।
অক্টোবরজুড়ে এই আন্দোলনের মাসটি হবে বিশৃঙ্খল, বেপরোয়া ও কোলাহলপূর্ণ। একই সঙ্গে এই দৃশ্য রোমান্টিকতার জন্মও দিতে পারে। এমন অসাধারণ দৃশ্যমান শক্তিতে ভরপুর তরুণ আন্দোলনের দিকে তাকিয়ে এর বিশুদ্ধতা, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস কিংবা তীব্র ক্রোধের ওপরই শুধু মনোযোগ দেওয়ার একটি প্রবল প্রলোভন থাকবে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ