রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে প্রসবকালে নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সংবাদ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন খাইরাতুন হিসান কেয়া নামের এক নারী চিকিৎসক। তার এমন মন্তব্যে ফেসবুকসহ সুশীল সমাজে আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
গত শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে এই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে স্বাভাবিক প্রসব করানোর সময় নবজাতকের মাথায় গভীর ক্ষত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুমিল্লায় ওই প্রসূতি চিকিৎসাধীন।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে ওই চিকিৎসক লেখেন, আপনারা একটা কাজ করবেন, এখন থেকে ডেলিভারির ব্যথা উঠলে সাংবাদিকদের কাছে যাবেন। অথবা ব্যথা কেন উঠছে না, পানি কেন ভাঙছে- এই যাবতীয় সিদ্ধান্ত সাংবাদিক থেকে নিয়ে উনাকেই বলবেন চিকিৎসাটা করতে।
পোস্টের অন্য অংশে তিনি লেখেন, ‘আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নরমাল ডেলিভারি করেছি। আপনারা কত বড় নিমকহারাম মানুষজন! এখন থেকে আমি বলে দিচ্ছি, যেসব রোগী ৫ মাসের পর থেকে আমার ফলোআপে থাকবে, শুধু তাদের দায়িত্ব আমি নেব। অন্য কারও রোগী আমার কাছে আসবেন না দয়া করে। আমি তাদের দেখবও না, ডেলিভারিও করব না।’
জানা গেছে, উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের খামার পুস্করনী গ্রামের প্রবাসী মোস্তাফিজুর রহমানের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নাজমা আক্তার গর্ভধারণের পর থেকে চৌদ্দগ্রাম হাইস্কুল রোডের একটি বেসরকারি হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক আফরোজা হাশেম নূপুরের অধীনে নিয়মিত চিকিৎসাধীন ছিলেন।
গত ২২ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ চিকিৎসকের পরামর্শে আল্ট্রাসাউন্ড করানো হলে জানানো হয়, গর্ভের শিশুটি পানিশূন্যতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং সিজারিয়ান অপারেশনের মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে একই হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক খাইরাতুন হিসান কেয়া ওই প্রসূতিকে নরমাল ডেলিভারির শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
গত শনিবার (৩ অক্টোবর) গভীর রাতে নাজমা আক্তারের প্রসববেদনা উঠলে স্বজনেরা চিকিৎসক খাইরাতুন হিসান কেয়ার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। তার পরামর্শে ভোর আনুমানিক ৫টায় রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে ডা. কেয়া বেলা ১১টার পর হাসপাতালে আসেন।
অভিযোগ উঠে, এরপর দীর্ঘ সময় ধরে টানাটানি করে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা চালানো হয়। বেলা আড়াইটার দিকে টানাহেঁচড়ার কারণে নবজাতকের মাথায় গুরুতর আঘাত ও রক্তাক্ত জখম হয়। একপর্যায়ে ডা. কেয়া চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনি চিকিৎসক নাহিদা সুলতানাকে সেখানে ডেকে আনেন। রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থা দেখে তাকে দ্রুত আইসিইউ সুবিধা সম্বলিত হাসপাতালে নিয়ে সিজার করানোর পরামর্শ দেন তিনি। কিন্তু এরপরও স্বাভাবিক প্রসবের জোর চেষ্টা চালিয়ে গেলে নবজাতক জরায়ুমুখে আটকে মারা যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে প্রসূতি নাজমা আক্তারের শারীরিক অবস্থারও চরম অবনতি ঘটে। পরে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুমিল্লার ইনসাফ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মৃত সন্তান প্রসব করানো হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ভুক্তভোগীর প্রবাসী স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান মুঠোফোনে সাংবাদিকদের জানান, প্রথম বাচ্চা জন্ম নিবে বলে আমি বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলাম। ডা. কেয়ার অবহেলায় আমার সন্তানের মৃত্যু হয়। আমার স্ত্রীও এখন আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুমিল্লায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পুরো পরিবার চিন্তিত। আমরা এ ঘটনার সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে দোষী চিকিৎসকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার বিচার দাবি ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরই চিকিৎসক খাইরাতুন হিসান কেয়া ফেসবুকে ওই বিতর্কিত পোস্টটি করেন। এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পোস্ট দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘যা লিখেছি, তা আমার ফেসবুকেই আছে।’
এ ব্যাপারে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রশিদ আহমেদ চৌধুরী তোফায়েল বলেন, বিষয়টি আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি। ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দিলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম