মাগুরা প্রতিনিধি: মাগুরা পৌর বাস টার্মিনালে রয়েল এক্সপ্রেসের কাউন্টারে যুবদল নেতা মো. শাকের হোসেনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার ভোরে কাউন্টার থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে ময়নাতদন্তের সময় তাঁর মাথার ভেতর থেকে গুলির আলামত উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা টার্গেট কিলিং বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মনোয়ার হোসেন খান। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।
নিহত শাকের হোসেন মাগুরা পৌরসভার পারনান্দুয়ালী বিশ্বাসপাড়া এলাকার মৃত কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে পৌর বাস টার্মিনালে রয়েল এক্সপ্রেসের কাউন্টার পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. কৃষ্ণ বিশ্বাস জানান, ময়নাতদন্তের সময় শাকেরের মাথার পেছনের আঘাত পরীক্ষা করে ভেতর থেকে গুলির আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। আলামতটি সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পরে দেওয়া হবে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কাউন্টারের আরেক পরিচালক বিপুল কুমার দাস জানান, এক যাত্রীর কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, কাউন্টারের কাছাকাছি একটি মোটরসাইকেল আসার পর গুলির মতো শব্দ শোনা যায়। পরে মোটরসাইকেলটি দ্রুত চলে যায় বলে ওই যাত্রীর স্ত্রী দাবি করেছেন। তবে মোটরসাইকেলটির সঙ্গে শাকেরের মৃত্যুর কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ
শাকেরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পৌর বাস টার্মিনালের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। পরে সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন খান ঘটনাস্থলে গিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেন। তাঁর অনুরোধে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও বিক্ষোভ মিছিল করেন।
পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব আব্দুর রহিম ও ছাত্রদল নেতা শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, শুরু থেকেই তাঁরা ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করছেন। ময়নাতদন্তে গুলির আলামত পাওয়ার তথ্য সামনে আসায় তাঁরা দ্রুত জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানান।
মাগুরা সদর থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি সৈয়দ জুলফিকার তুষার বলেন, শাকের দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁদের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ মাগুরার মানুষ শোকাহত। তিনি দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে বাস টার্মিনালকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
পরিবহন কাউন্টার মালিক সমিতির সেক্রেটারি মোহাম্মদ রানা মোল্লা বলেন, বাস টার্মিনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন ঘটনা পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তিনি দ্রুত জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং টার্মিনালের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান। পরিবহনসংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিরাও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও টার্মিনালের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন।
তদন্ত চলছে, এখনো মামলা হয়নি
মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন বলেন, শাকেরের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। সুরতহাল প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। বিভিন্ন দিক ও সংগৃহীত আলামত বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় এখনো কোনো অভিযোগ দাখিল করা হয়নি বলেও জানান তিনি।
‘মাগুরার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা’
সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মনোয়ার হোসেন খান বলেন, শাকেরের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে শাকের সামনের সারিতে ছিলেন। তাঁর মতে, ঘটনাটি টার্গেট কিলিং হয়ে থাকলে তা পুরো মাগুরার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করবে।
তিনি বলেন, মাগুরায় আগে বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা একজন তরুণের এমন মৃত্যু পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঘটনার পেছনের কারণ উদ্ঘাটন ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলেছেন জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করবে। তবে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার আগে ঘটনার সব দিক নিশ্চিত হওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
শাকেরের পরিবারে দুটি ছোট সন্তান রয়েছে এবং তাঁর মা অসুস্থ বলে উল্লেখ করে সংসদ সদস্য পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি পৌর বাস টার্মিনালে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান তিনি।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ