নড়াইল প্রতিনিধি: শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, বিদ্যালয় পরিচ্ছন্ন রাখা, বৃক্ষরোপণ ও সাধারণ মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়ার মতো মহৎ উদ্দেশ্যের কথা বলে নড়াইল সদর উপজেলার আগদিয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় ‘নভেরা লার্নিং হাব’ স্কুল ক্লিনিং প্রোগ্রাম ও সেমিনার। কিন্তু বাস্তবে কর্মসূচির বিভিন্ন আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মহৎ উদ্দেশ্যের প্রচারের আড়ালে কর্মসূচির বাস্তব চিত্র ছিল হতাশাজনক।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ১০টায় অনুষ্ঠান শুরুর কথা থাকলেও শুরু হয় প্রায় সাড়ে ১১টায়। অথচ সকাল ৯টায় উপস্থিত থাকার কথা বলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগে থেকেই বিদ্যালয়ে বসিয়ে রাখা হয়। আয়োজকদের সময়জ্ঞান ও ব্যবস্থাপনার এমন দুর্বলতায় শুরুতেই ভোগান্তিতে পড়েন তাঁরা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ তৈরি হয় আপ্যায়ন নিয়ে। দিনভর কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় মাত্র ৫ টাকার একটি বিস্কুটের প্যাকেট। প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার্থীদের নিয়ে এত বড় আয়োজনের প্রচার থাকলেও তাঁদের ন্যূনতম আপ্যায়নের ব্যবস্থা কি এতটাই দায়সারা হতে হবে?
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির চিত্রও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সেখানে প্রায় ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি আকারের একটি ছোট নিমগাছ রোপণ করা হয়। বৃক্ষরোপণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি কি কেবল ছবি তোলা ও আনুষ্ঠানিকতা পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? একটি গাছ রোপণ করলেই কি পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? গাছটির পরিচর্যা ও বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা কে দেবে?
পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি নিয়েও উঠেছে সমালোচনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ময়লা-আবর্জনাযুক্ত স্থান পরিষ্কারের পরিবর্তে আগে থেকেই পরিষ্কার জায়গায় ঝাড়ু দেওয়ার আয়োজন করা হয়। যেখানে পরিচ্ছন্নতার বাস্তব প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে পরিষ্কার জায়গায় ঝাড়ু দেওয়ার এমন কর্মসূচি কতটা অর্থবহ? এটি কি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতা প্রদর্শন?
অন্যদিকে, কর্মসূচির ফাঁকে গ্রামের সাধারণ মানুষকে সংগঠনের সদস্য করার প্রচারণা চালানো হয়। এ সময় সাংবাদিকরা আয়োজকদের কাছে জানতে চান, সাধারণ মানুষ কেন তাঁদের সংগঠনের সদস্য হবেন এবং সদস্য হলে তাঁরা কী ধরনের সুনির্দিষ্ট সুবিধা পাবেন? অভিযোগ রয়েছে, এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি আয়োজকরা। ফলে সংগঠনের সদস্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া গ্রামের মানুষের জমিজমা ও বিভিন্ন মামলা-সংক্রান্ত বিষয়ে আইনি সহায়তার ক্যাম্পেইন করা হয়। কিন্তু বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরেও যেখানে অনেক মানুষ ন্যায়বিচার ও সমস্যার সমাধান পান না, সেখানে এক দিনের ক্যাম্পেইনে তাঁদের কী ধরনের কার্যকর আইনি সহায়তা দেওয়া সম্ভব? কারা এই সহায়তা দেবেন, কীভাবে দেবেন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের পাশে থাকবেন কি না,এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এসব কর্মসূচির প্রকৃত লক্ষ্য কী? শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশ রক্ষা ও অসহায় মানুষের আইনি সহায়তা যদি মূল উদ্দেশ্য হয়, তাহলে প্রতিটি কার্যক্রমে তার বাস্তব প্রতিফলন থাকা জরুরি। শুধু ব্যানার, প্রচারণা, আনুষ্ঠানিকতা ও সদস্য সংগ্রহের মধ্য দিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রমাণ দেওয়া যায় না।
গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে সংগঠনের সদস্য করার আগে সংগঠনের উদ্দেশ্য, কার্যক্রম, অর্থের উৎস, সদস্যদের দায়িত্ব ও তাঁদের প্রাপ্ত সুবিধা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দেওয়া কি আয়োজকদের দায়িত্ব নয়? সামাজিক উন্নয়নের নামে আয়োজিত কোনো কর্মসূচি যেন লোকদেখানো আয়োজন কিংবা ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম না হয়ে ওঠে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। তাই এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে আয়োজকদেরই। এ বিষয়ে আয়োজক সংগঠনগুলোর বক্তব্য ও কর্মসূচির ব্যয়-সংক্রান্ত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব