ফেনী প্রতিনিধি, রিপোর্টার্স২৪
স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের পানিতে ডুবেছে ফেনী। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অন্তত ৩৬টি স্থানে নতুন করে ভাঙনের খবর জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছর না ঘুরতেই আবারও বাঁধ ভাঙায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে ফেনীবাসী।
শনিবার (১২ জুলাই) বাঁধ ভাঙনের চার দিন পর এই তথ্য জানায় পাউবো। তবে এতো দেরিতে তথ্য প্রকাশ করায় ক্ষুব্ধ ক্ষতিগ্রস্তরা। তারা বলছেন, গত বছর ২০ কোটির বেশি টাকায় মেরামত হওয়া বাঁধগুলো সঠিক তদারকির অভাবে আবারও ভেঙে পড়েছে।
১১২টি গ্রাম প্লাবিত, আশ্রয়কেন্দ্রে সাড়ে ৯ হাজার মানুষ
টানা বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গত মঙ্গলবার (৮ জুলাই) ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। পরবর্তীতে ছাগলনাইয়া, ফেনী সদর ও দাগনভূঞা উপজেলার কিছু অংশেও পানি ঢুকে পড়ে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, মোট ১১২টি গ্রামের লাখো মানুষ এ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে ৮৩টি, যেখানে সাড়ে ৯ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
কৃষি-মৎস্যে ক্ষতি, হারাচ্ছে জীবিকা
জেলা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় মাছচাষে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ১২ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ হাজার ৫৬৪ হেক্টর ফসলি জমি। প্রাণিসম্পদ খাতেও ক্ষতির পরিমাণ ৬৪ লাখ টাকার বেশি।
কমুয়া এলাকার খামারি হারুন বলেন, “গতবারের মতো এবারও মাছের ঘের ভেসে গেছে, মুরগিও মরেছে। প্রতিবারই এমন হয়—বাঁধ ভাঙে, পানি আসে, লোকজন আশ্বাস দেয়। এসব যেন এখন রুটিন হয়ে গেছে।”
বাঁধ ভাঙন বারবার, প্রতিকার নেই
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, এবার পরশুরামে ১৯টি ও ফুলগাজীতে ১৭টি—মোট ৩৬টি স্থানে বাঁধ ভেঙেছে। যদিও প্রথমে তারা মাত্র ২০টি ভাঙনের কথা জানিয়েছিল। পরে মাঠপর্যায়ে গিয়ে সংখ্যাটি বাড়ানো হয়।
বাঁধ ভাঙনের কারণ ব্যাখ্যা করে ফেনী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তার হোসেন মজুমদার বলেন, “শুরুতে আমরা শুধু ভাঙনের নাম অনুযায়ী তথ্য পেয়েছিলাম। এখন সরেজমিন ঘুরে চূড়ান্ত তালিকা করা হয়েছে। পানি নামলে সংস্কার কাজ শুরু হবে।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পিত নদীশাসন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণে বরাবরই ব্যর্থ পাউবো। তারা শুধু বরাদ্দ ও দায়সারা কাজেই ব্যস্ত থাকে।
পরশুরামের বাসিন্দা মাসুম বলেন, “চার দিনেও কোনো কর্মকর্তা এলেন না। এবার আমরা টেকসই বাঁধের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলব।”
ত্রাণ সহায়তা চলছে, চাওয়া হয়েছে বাড়তি বরাদ্দ
জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানান, “ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরও ৪০ লাখ টাকার শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও গবাদিপশুর খাবার চাওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীও ত্রাণ বিতরণে সহায়তা করছে।”
পেছনের বছরেও একই দুর্ভোগ
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ভয়াবহ বন্যায় ফেনী জেলাজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ১৯ আগস্ট শুরু হওয়া সেই বন্যায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৯ জন। বিভিন্ন অবকাঠামো ও কৃষিখাতে শত কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব দেয় প্রশাসন।
.
রিপোর্টাস২৪/এস