আশিস গুপ্ত
যে হিমালয় যুগ যুগ ধরে এশিয়ার জলের আধার, প্রকৃতির শান্ত অভিভাবক এবং আধ্যাত্মিক শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, সেই পাহাড়ের আকাশেও এখন ভেসে বেড়াচ্ছে বিষ।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রকাশিত একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, হিমালয়ের উচ্চভূমির বৃষ্টির মেঘের জলবিন্দুতে জমা হচ্ছে সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও আর্সেনিকের মত ক্ষতিকর ভারী ধাতু। এই আবিষ্কার শুধু পরিবেশগত বিপদেরই পূর্বাভাস দেয় না, বরং এটি হিমালয়ের জীববৈচিত্র্য, মানব স্বাস্থ্য এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যৎ পানিসুরক্ষাকে এক জটিল সংকটে ঠেলে দেয়।
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা Environmental Science & Technology-এ প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়, নেপালের মুস্তাং ও খুম্বু অঞ্চলের ৪৫০০–৫০০০ মিটার উচ্চতা থেকে সংগৃহীত মেঘজল নমুনায় সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এই গবেষণায় ব্যবহৃত ছিল উচ্চ সংবেদনশীল স্পেকট্রোমেট্রি প্রযুক্তি, যা দেখিয়েছে প্রতি লিটারে ১২.৬ মাইক্রোগ্রাম সিসা, ৪.১ মাইক্রোগ্রাম ক্যাডমিয়াম ও ২.৩ মাইক্রোগ্রাম পারদের উপস্থিতি—যা দীর্ঘমেয়াদি মানব স্বাস্থ্য ও ইকোসিস্টেমের জন্য বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়।
প্রথমে এই বিষয়টি বৈজ্ঞানিক মহলে কৌতূহলের জন্ম দিলেও, পরে একাধিক গবেষণায় একই ধরণের উপাত্ত পাওয়া যায়। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলে ও নেপালের ট্রিবুভবন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় ২০২২ সালে জানানো হয়, হিমালয়ের হিমবাহ অঞ্চলের ওপরে জমা তুষার ও বরফে প্রতি কেজিতে গড়ে ২.৭ মাইক্রোগ্রাম সিসা ও ১.৩ মাইক্রোগ্রাম পারদ শনাক্ত হয়েছে, যা প্রমাণ করে এই ধাতুগুলি কেবল বাতাসে ভেসে আসছে না, বরং জমা হয়ে থেকে ভবিষ্যতে পানিস্রোতের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে।বিশিষ্ট পর্বত গবেষক ও জলবায়ুবিদ অধ্যাপক দীপেন্দ্র চৌধুরী তার ২০২৪ সালের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন, “The transboundary nature of airborne toxins in the Himalayas means the problem is no longer local—it is geopolitical.” অর্থাৎ, বায়ুর মাধ্যমে বহুল দূরত্ব অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়া এই ধাতুগুলি হিমালয়কে শুধু একটি ভূপ্রকৃতির সমস্যা হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতিরও অংশে পরিণত করেছে। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, ভারতের ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের কয়লাভিত্তিক শিল্প এবং চীনের সিচুয়ান অঞ্চলের বৈদ্যুতিন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থেকে নিঃসরিত ধোঁয়া হিমালয়ের উপরিভাগে মাত্র ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যেতে পারে।
এই ধাতুসমূহ হিমালয়ে কীভাবে পৌঁছাচ্ছে, তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট ডেটা ও বাতাসের গতিপথ বিশ্লেষণ করেছেন। NASA-এর MODIS ও ESA-এর Sentinel-5P স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে দেখা গেছে, যেসব বাতাস হিমালয়ের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে, সেগুলি আগে ভারতের গুজরাট, দিল্লি ও ঝাড়খণ্ডের শিল্পাঞ্চল এবং চীনের চেংদু-চংকিং উপত্যকার উপর দিয়ে চলে আসছে। Science of The Total Environment পত্রিকায় ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, “Back-trajectory analysis confirms air masses over the Himalayas have previously passed through the Indo-Gangetic Plain, a known industrial hotspot.” অর্থাৎ, হিমালয়ের উপর ভেসে আসা মেঘ ও ধোঁয়া মূলত শিল্পঘন উপত্যকা অঞ্চল থেকে উঠে আসে এবং সেখানে থেকে ধাতুকণাও পরিবাহিত হয়।এই ধাতুসমূহের উৎসে রয়েছে কয়লা চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইস্পাত কারখানা, ইলেকট্রনিক বর্জ্য পোড়ানো কেন্দ্র এবং কীটনাশক উৎপাদনের কারখানা। ভারতে এবং চীনে এখনও বহু কারখানায় পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের মান অনেক দুর্বল, ফলে ধাতুকণা বাতাসে উঠে আসার হার অত্যন্ত বেশি। কিন্তু শুধু দূরবর্তী শিল্প এলাকা থেকেই এই ধাতু আসছে তা নয়, হিমালয়ের মধ্যেই অনেক ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী দূষণ উৎসও সক্রিয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ছাউনিতে ব্যবহৃত ডিজেল জেনারেটর, স্থানীয় বাজারে প্লাস্টিক পোড়ানো, কাঠ জ্বালানোর ধোঁয়া, পর্যটকদের যানবাহন—সবকিছু মিলে স্থানীয় বায়ুদূষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
দেহরাদুনে অবস্থিত Institute of Himalayan Environment-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “Micro-scale pollution sources in mountain towns often remain undocumented but contribute significantly to airborne toxins.”২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ গবেষণায় দেখা যায়, হিমালয়ের জলপ্রবাহে ভারী ধাতুর ঘনত্ব প্রতি বছর ১.৭ শতাংশ হারে বাড়ছে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন হিমবাহ গলনের পানি ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
গবেষণাটিতে বলা হয়, “Lead levels in downstream rivers like the Koshi and Teesta are already reaching thresholds of concern for drinking water.”এই ধাতুগুলির একটি বৈশিষ্ট্য হল, এগুলি দীর্ঘস্থায়ী। বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে উঠে গেলে সেগুলি অনেক দিন ভেসে থাকতে পারে এবং পরবর্তীতে ঠান্ডা আবহাওয়ায় কুয়াশা, বৃষ্টি বা তুষারের মাধ্যমে জমে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলনের হার বেড়ে যাওয়ায়, আগে জমা থাকা এই ভারী ধাতুগুলিও এখন জল প্রবাহে ছড়িয়ে পড়ছে। Intergovernmental Panel on Climate Change (IPCC) ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে সতর্ক করে জানায়, “Cryospheric contamination by industrial heavy metals is no longer limited to the Arctic; the Himalayas are now a hotspot.”এই দূষণ একদিকে যেমন হিমালয়জুড়ে মানব ও অমানব বাস্তুসংস্থানের জন্য হুমকি, অন্যদিকে উপত্যকায় প্রবাহিত বড় বড় নদীগুলিকে বিষাক্ত করে তোলার আশঙ্কাও থেকে যায়।
গঙ্গা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ইরাবতী ও মেকং নদী—সবকটিই হিমালয় থেকে উৎপন্ন। হিমালয় অঞ্চলে জমা হওয়া ধাতুসমূহ যদি গলে নদীর পানিতে পৌঁছে যায়, তাহলে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার ৭০ কোটিরও বেশি মানুষ এই বিষক্রিয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। UNICEF-এর ২০২১ সালের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, “Chronic lead exposure in Himalayan watersheds could affect over 120 million people downstream, especially children.”ভারী ধাতু শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকে এবং ধীরে ধীরে স্নায়ুতন্ত্র, বৃক্ক ও যকৃতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
শিশুদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয়, আইকিউ হ্রাস পায়, এবং স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়। সিসা ও পারদের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ক্যান্সার পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাতে পারে। এর বিপরীতে দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো কোনও দেশই হিমালয়ের উন্মুক্ত মেঘজল বা তুষারস্তরের ধাতু পরীক্ষা নিয়মিতভাবে করে না।এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক অনীহা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার অভাব। SAARC বা BIMSTEC-এর মত আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে হিমালয়ের পরিবেশ নিয়ে কোনও সমন্বিত গবেষণা বা দূষণ পর্যবেক্ষণ কাঠামো নেই।
UNEP-এর ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে হতাশার সুরে বলা হয়, “The Hindu Kush Himalayan region remains under-monitored despite its crucial role in the water-energy-food nexus of Asia.” অর্থাৎ হিমালয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটা নজরদারির আওতায় নেই। এই ফাঁকেই ছড়িয়ে পড়ছে বিপদ।পরিবেশবিদদের মতে, এখনই যদি একটি আঞ্চলিক হিমালয় দূষণ মনিটরিং সংস্থা গঠন করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে হিমালয়ের পানি, বাতাস ও খাদ্যশৃঙ্খল বিষাক্ত হয়ে পড়বে। জাতীয় পর্যায়ে হিমালয় রাজ্যগুলিকে শক্ত পরিবেশ আইন প্রয়োগ করতে হবে, সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে ডিজেল ও প্লাস্টিক পোড়ানো নিষিদ্ধ করতে হবে এবং পর্যটন কার্যক্রমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।
একইসাথে, উচ্চতর গবেষণা ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ প্রয়োজন—যাতে তুষার ও মেঘ থেকে নিয়মিতভাবে নমুনা নিয়ে ধাতু পরীক্ষা করা যায় এবং দূষণের উৎস ও গতিপথ বোঝা যায়।সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি পরিবেশ সচেতন জনগণের, যারা বুঝবে যে হিমালয় কেবল পাহাড় নয়—এটি আমাদের ভবিষ্যতের জলাধার, আমাদের সন্তানদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, এবং এশিয়ার প্রাণরেখা।
সেই হিমালয়ের মেঘ যখন বিষ নিয়ে নামে, তখন আর শুধু পর্বতের নয়, এটি গোটা সভ্যতার সংকেত হয়ে ওঠে। এখন আমাদের হাতে আছে সময়—সচেতনতার, গবেষণার, এবং সম্মিলিত প্রতিরোধের। এই দায়িত্ব আর ফেলা যায় না শুধু বরফে চাপা রেখে।
-আশিস গুপ্ত, ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক এবং সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট চেইঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম ( সাকজেএফ)
রিপোর্টার্স ২৪/এমবি