রিয়াজুল হক :
বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন যেন ক্রমেই জলবায়ুর ওঠানামায় বাঁধা পড়ছে। কখনও ঘূর্ণিঝড়, কখনও বন্যা, আবার কখনও দীর্ঘস্থায়ী খরা। প্রতিটি দুর্যোগ শুধু মানুষকেই নয়, অর্থনীতির রক্তসঞ্চালনকেও ধাক্কা দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বছরে গড়ে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। অর্থাৎ, প্রকৃতির এই খামখেয়াল যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই উন্নয়নের গতি শ্লথ হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান এখনো প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। আর গ্রামীণ কর্মসংস্থানের প্রধান উৎসও এই কৃষি খাত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি যেন ধাপে ধাপে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে লবণাক্ততা এতটাই বেড়েছে যে, অনেকেই ধান চাষ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অনেক চাষীর অভিযোগ, 'আগে আউশ, আমন, বোরো—তিন মৌসুমেই ধান হতো, এখন এক মৌসুমই ঠিকমতো হয় না।'
বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হচ্ছে হাওর ও উত্তরাঞ্চলে। খরা বাড়ছে বরেন্দ্র অঞ্চলে। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ফলন কমছে। শেষ পর্যন্ত ভোক্তার জন্য পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প, যা বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রপ্তানি আয়ে অবদান রাখে। এটিও জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা খাচ্ছে। অন্যদিকে, বিদেশি ক্রেতারা এখন 'সবুজ' উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছেন। কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, এসব মানদণ্ড পূরণ না করলে বাজার হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি কারখানার পক্ষে হঠাৎ বড় বিনিয়োগ করে সবুজ প্রযুক্তি আনা কঠিন।
ঢাকা, চট্টগ্রাম বা খুলনার মতো বড় শহরগুলোতে হঠাৎ বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত দৃশ্য। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস, দোকান সবখানেই উৎপাদনশীল সময় নষ্ট হয়। শুধু ঢাকায় জলাবদ্ধতার কারণে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়ে থাকে। এছাড়া, নদীভাঙন ও উপকূলীয় ভূমি হারানোর কারণে হাজার হাজার পরিবার শহরমুখী হচ্ছে, যা নগরের অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং বেকারত্বের হার বাড়াচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বড় প্রভাব পড়ছে মানুষের কর্মক্ষমতার ওপর। তীব্র তাপপ্রবাহে খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিকদের শ্রমঘণ্টা কমে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় তাপজনিত কারণে প্রায় ৫% শ্রমঘণ্টা নষ্ট হবে, যার বড় প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে।
বাংলাদেশের মৎস্য খাত দেশের পুষ্টি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমুদ্রের উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় মাছের প্রজনন কমছে, মিঠা পানির মাছ লবণাক্ত পানিতে বাঁচতে পারছে না। এতে জেলেদের আয় কমছে। অনেকে পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী? সহজ উত্তর হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে অর্থনীতির শত্রু হতে না দেওয়া যাবেনা। এজন্য কিছু কার্ব্যযকরী বস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম বা খুলনায় কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট অচল হয়ে যায়। গ্রামের বাঁধ ভেঙে ফসল নষ্ট হয়। এসব ঠেকাতে শহরে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড নালা ও পাম্প স্টেশন তৈরি করা প্রয়োজন। উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ উঁচু ও মজবুত করতে হবে এবং নদীর তীর সংরক্ষণে জিওটেক্সটাইল ব্যাগের ব্যবহার প্রয়োজন। খোলা জায়গা ও জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে অতিবৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবে সরে যেতে পারে।
কৃষি খাত দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভরসা। কিন্তু জলবায়ুর ধাক্কা সামলাতে হলে লবণ সহিষ্ণু ও খরা সহনশীল জাতের ধানের উৎপাদন বাড়াতে হবে। শুধু ধান নয়, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, যা কম পানিতে হয়, সেদিকে জোর দিতে হবে। সৌরচালিত পাম্প, ড্রিপ ইরিগেশন এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এতে পানির অপচয় কমে যাবে।
রপ্তানি খাত, বিশেষ করে পোশাক শিল্প, এখন আন্তর্জাতিক বাজারে 'সবুজ' উৎপাদনের চাপের মুখে রয়েছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য কারখানার ছাদে সৌর প্যানেল বসাতে হবে, বায়ুশক্তি ব্যবহার করতে হবে। জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এলইডি আলো, আধুনিক বয়লার, কম বিদ্যুৎ খরচের মেশিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
উপকূলে বসবাসকারী প্রায় তিন কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার। তাদের অর্থনীতি রক্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান যেমন ইকোট্যুরিজম, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, হাঁস-মুরগি পালনের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনে ঋণ প্রদান করা যেতে পারে। মৎস্য খাতের আধুনিকায়নের জন্য গভীর সমুদ্র মাছ ধরার জাহাজ, ঠান্ডা সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাত শিল্পের প্রসার করতে হবে। এছাড়া, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসনের জন্য সহজ ঋণ ও কৃষি-বীমার সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়ন জরুরি। স্থানীয় আবহাওয়া মডেল তৈরি করতে হবে, যাতে আরও নির্ভুল পূর্বাভাস পাওয়া যায়। এছাড়া বন্যা সহনশীল অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, যতই বড় পরিকল্পনা হোক, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া তা টেকসই হয় না। এজন্য স্কুল পর্যায় থেকেই শিশুদের জলবায়ু সচেতনতা জরুরি। সাথে সাথে সচেতন হয়ে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের প্রচলন বাড়াতে হবে।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে বেশি অর্থ আনার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। কারণ উন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণসহ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বেশি দায়ী , অথচ মাশুল দিতে হচ্ছে আমাদের।
জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি আজকের অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করছে। কৃষকের জমি, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা, শিল্পের উৎপাদন, রপ্তানির আয় সবকিছুই প্রকৃতির মেজাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তাই জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার এখনই সময়। এতে শুধু ক্ষতি কমবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান, সবুজ প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার নতুন দরজাও খুলে যাবে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সময় থাকতে প্রস্তুতি নিতে পারব কিনা? সেটা না হলে, জলবায়ুর ধাক্কা আমাদের অর্থনীতির স্বপ্নকেই ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
লেখকঃ রিয়াজুল হক, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও যুগ্মপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।