আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি: করাচির একটি বিশাল শপিংমলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। এখনো ৬০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো। সোমবার ধোঁয়ায় পোড়া ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজ শুরু করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
রয়টার্স জানায়, শনিবার গভীর রাতে করাচির ঐতিহাসিক এলাকার গুল প্লাজায় আগুনের সূত্রপাত হয়। বহুতল এই বিপণিবিতানে প্রায় ১ হাজার ২০০টি দোকান রয়েছে, যার আয়তন একটি ফুটবল মাঠের চেয়েও বড়। আগুন নেভাতে টানা ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভবনজুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে এবং রাতভর দমকলকর্মীরা আগুন নেভাতে চেষ্টা চালাচ্ছেন। সোমবার ভবনটি ঠান্ডা করার পাশাপাশি রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ, বেঁকে যাওয়া লোহা, ভাঙা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও দোকানের সাইনবোর্ড সরানোর কাজ শুরু হয়।
সোমবার বিকেল নাগাদ ভবনের অধিকাংশ অংশ ধসে পড়ে। অবশিষ্ট কাঠামো যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে—এই আশঙ্কায় ক্রেন দিয়ে তা ভেঙে ফেলা হয়।
নিখোঁজদের স্বজনরা ঘটনাস্থলে ভিড় করেন। কাসির খান জানান, শনিবার সন্ধ্যায় তাঁর স্ত্রী, পুত্রবধূ ও তাঁর মেয়ে শাশুড়ি কেনাকাটার জন্য ওই মলে গিয়েছিলেন। এরপর থেকে তাঁদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, উদ্ধার তৎপরতা যদি দ্রুত হতো, তাহলে অনেক মানুষকে বাঁচানো যেত।
এদিকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বস্তায় করে মানবদেহের অংশ উদ্ধার করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। প্রচণ্ড তাপের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে উদ্ধারকর্মীরা বারবার পানি পান করে বিরতি নিচ্ছেন।
এধি ফাউন্ডেশনের উদ্ধার কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ আমিন বলেন, নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। তবে সিন্ধু প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলি শাহ আগেই নিহতের সংখ্যা ১৫ বলে জানিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগুনে আহত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন, যাদের মধ্যে ২২ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
রোববার রাতে করাচির মেয়র মুর্তাজা ওয়াহাব ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয়দের ক্ষোভ চরমে ওঠে। দমকল বিভাগের দেরিতে পৌঁছানো নিয়ে বিক্ষোভ ও সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে দেখা যায়।
কোসার বানু জানান, একটি বিয়ের কেনাকাটার জন্য তাঁর পরিবারের ছয় সদস্য মলে গিয়েছিলেন। শেষবার যোগাযোগের সময় তাঁরা বলেছিলেন, ১৫ মিনিটের মধ্যেই বাড়ি ফিরবেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, এখন আমাদের একমাত্র আশা—কতটা দেহাংশ পাওয়া যায়।
উদ্ধারকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ১০টা ৩৮ মিনিটে প্রথম জরুরি কল আসে। ততক্ষণে নিচতলার দোকান থেকে আগুন ছড়িয়ে ওপরের তলাগুলো গ্রাস করে ফেলে। ভবনের ভেতরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় ঘন ধোঁয়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়।
প্রাদেশিক পুলিশ প্রধান জাভেদ আলম ওধো প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক ত্রুটিকে আগুনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও মুখ্যমন্ত্রী শাহ বলেন, আগুনের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তিনি জানান, ঘটনার তদন্ত হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে করাচির একটি শিল্প এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন। সেটি ছিল শহরের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। বিশ্লেষকদের মতে, গুল প্লাজার এই আগুন গত এক দশকের মধ্যে করাচির সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাগুলোর একটি।