| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ফ্রান্স জ্বলছে: রাজপথে আগুন, রাষ্ট্রের সংকট এবং ফরাসি গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ১৮, ২০২৬ ইং | ২৩:১২:০৪:অপরাহ্ন  |  ৪১০৩ বার পঠিত
ফ্রান্স জ্বলছে: রাজপথে আগুন, রাষ্ট্রের সংকট এবং ফরাসি গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

আশিস গুপ্ত : ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সের একাধিক শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা ব্যবস্থার দুরবস্থা এবং সরকারি পরিষেবার সংকোচনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ হিংসাত্মক সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্যারিস, মার্সেই, লিয়ঁ, লিমোজ এবং বোর্দোর মতো শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে । সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনে কয়েক লক্ষ মানুষ অংশ নেন। তবে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং কিছু গোষ্ঠীর হিংসাত্মক কার্যকলাপকে এক করে দেখলে এই সংকটের প্রকৃত চরিত্র বোঝা যাবে না। ফ্রান্সে আগুন জ্বলছে—এই শিরোনাম তাই কেবল কয়েকটি শহরের রাস্তায় জ্বলতে থাকা গাড়ি, ভাঙা দোকান কিংবা সরকারি ভবনের ছবি নয়। এর আড়ালে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক অসন্তোষ, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ, তরুণ প্রজন্মের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট এবং প্রতিবাদ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গভীর বিতর্ক। ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি এবং স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত ফরাসি প্রজাতন্ত্রের সামনে প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্র কি নাগরিকদের ক্ষোভের কারণগুলি সমাধান করতে পারছে, নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে সেই ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তুলছে?

ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে গেলে মনে রাখতে হবে, দেশটির রাজপথের প্রতিবাদ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন থেকে ২০২৩ সালের পেনশন সংস্কার বিরোধী ধর্মঘট, পুলিশের গুলিতে কিশোর নাহেল মারজুকের মৃত্যুর পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ এবং ২০২৫ সালের সরকারি ব্যয় সংকোচন বিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি পর্বে ভিন্ন ভিন্ন দাবি সামনে এলেও তার গভীরে ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। চলতি  অক্টোবরের বিক্ষোভ সেই জমে থাকা অসন্তোষেরই নতুন বহিঃপ্রকাশ। 

১৭ অক্টোবরের ঘটনায় বিক্ষোভের ব্যাপকতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, সেদিন দেশজুড়ে ১১০টি মিছিলে প্রায় ৫ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ৮ লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে অনুমান করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একটি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অন্যদিকে, দ্য গার্ডিয়ান এবং কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১,২০০-র বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে, পুলিশের আহত হওয়ার খবরের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের আহত হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে।

এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল মূলত বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থার দুরবস্থা নিয়ে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে তা দেশের বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে মিশে যায়। শিক্ষক-সংকট, অতিরিক্ত ছাত্র ছাত্রী নিয়ে শ্রেণীকক্ষ পরিচালনা, জরাজীর্ণ স্কুলভবন, অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকা এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বৈষম্য—এই অভিযোগগুলি ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের কেন্দ্রে উঠে আসে। পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্য, মজুরি, পেনশন এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে অসন্তোষ। ফ্রান্সের সংবাদপত্র লে মঁদ জানিয়েছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠে ক্রেতেই শহরের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক-সংকটের প্রতিবাদ থেকে যে আন্দোলনের সূত্রপাত, তা মাত্র দশ দিনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১ অক্টোবরের মধ্যে এক হাজারেরও বেশি বিদ্যালয় কোনও না কোনওভাবে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল। ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ ছিল, অনেক শ্রেণিকক্ষে ৩০ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে বাধ্য হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেও বিকল্প শিক্ষক পাঠানো হচ্ছে না, আর বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শিক্ষার পরিবেশ ক্রমশ খারাপ হচ্ছে।

এই অভিযোগগুলির রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। শিক্ষা কেবল একটি সরকারি পরিষেবা নয়; ফরাসি প্রজাতন্ত্রের আদর্শে এটি সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কোনও শিশুর পারিবারিক আয়, সামাজিক পরিচয় কিংবা বসবাসের এলাকার ভিত্তিতে তার শিক্ষার সুযোগ নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়। অথচ দরিদ্র ও প্রান্তিক অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক-সংকট, দুর্বল পরিকাঠামো এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের বাধা যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে আনুষ্ঠানিক সমতার আড়ালে বাস্তব বৈষম্য আরও গভীর হয়। সেই কারণেই ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনকে শুধু বিদ্যালয়ের কয়েকটি দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। বিশেষত প্যারিসের উপকণ্ঠের দরিদ্র এলাকাগুলিতে এই অসন্তোষের সামাজিক ভিত্তি আরও বিস্তৃত। বহু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, আবাসনের ব্যয় এবং সরকারি পরিষেবার ঘাটতির মুখোমুখি। এই অঞ্চলগুলির তরুণদের কাছে শিক্ষাই সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান পথ। কিন্তু সেই শিক্ষা ব্যবস্থাই যখন তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন হতাশা সহজেই রাজনৈতিক ক্ষোভে রূপ নিতে পারে। ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে, রাষ্ট্র তাঁদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, অথচ তাদের কথা শুনছে না।

উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের জন্য ফ্রান্সের পারকুরসুপ (Parcoursup) ব্যবস্থাও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। এই অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তির আবেদন করে। ছাত্রছাত্রীদের একাংশের অভিযোগ, ভর্তি প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা, পছন্দের বিষয় না পাওয়া এবং সামাজিক পটভূমির প্রভাব তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। অর্থাৎ আন্দোলনের প্রশ্ন শুধু বিদ্যালয়ের ভবন মেরামত বা আরও শিক্ষক নিয়োগ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষার অধিকার, সামাজিক গতিশীলতা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। সরকার অবশ্য দাবি করেছে, শিক্ষার জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের বাজেট প্রস্তাবে জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রকের জন্য ১২০ কোটি ইউরো অতিরিক্ত বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু শিক্ষক সংগঠন ও ছাত্র সংগঠনগুলির বক্তব্য, মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এই বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। ইউরোনিউজ-এর ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বৃদ্ধি প্রায় ১.৬ শতাংশ, যেখানে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ১.৮ শতাংশ। ফলে নামমাত্র বরাদ্দ বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকার পাঁচ শতাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ে তিন হাজার বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছিল; কিন্তু ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারিত লক্ষ্যের মাত্র ৩৫ শতাংশ পূরণ হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এই পরিসংখ্যানগুলি আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। সরকার অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সেই অর্থ কত দ্রুত কাজে লাগছে, বিদ্যালয়ে কতজন শিক্ষক বাস্তবে পৌঁছচ্ছেন, শ্রেণিকক্ষে ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা কমছে কি না এবং শিক্ষার পরিবেশের উন্নতি হচ্ছে কি না—সাফল্য নির্ধারণের মাপকাঠি এগুলিই। ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক সংগঠনগুলির অসন্তোষের মূলেও রয়েছে এই ব্যবধান: সরকারি ঘোষণা এবং দৈনন্দিন বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব। 

তবে শিক্ষার সংকটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ফ্রান্সের বর্তমান অস্থিরতার পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে দেশের আর্থিক পরিস্থিতি। ফ্রান্সের সরকার একদিকে সরকারি ঘাটতি কমাতে চাইছে, অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য পরিষেবায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের দাবির মুখে পড়েছে। ঋণের বোঝা ও ঋণের সুদ মেটানোর চাপ বাড়লে সরকারি ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সংঘাতের সমাধান যদি প্রধানত ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে খোঁজা হয়, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। 

ফিনান্সিয়াল টাইমস-এর অক্টোবরের একটি প্রতিবেদনে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ প্রায় ৩.৫ লক্ষ কোটি ইউরো, অর্থাৎ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রায় ৪,৩০০ কোটি ইউরোর ব্যয় সংকোচন মূলক পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। 

সরকারি ঋণ বেশি হওয়া অবশ্যই অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের একটি গুরুতর সমস্যা। কিন্তু ঋণ নিয়ন্ত্রণের নামে কোন খাতে ব্যয় কমানো হবে, কোন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে এবং করের বোঝা কার ওপর পড়বে, সেই সিদ্ধান্তগুলি রাজনৈতিক। সরকার যদি আর্থিক স্থিতিশীলতার যুক্তিতে শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ সীমিত করে, অথচ নাগরিকদের কাছে উন্নত পরিষেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বজায় রাখে, তাহলে সেই দ্বন্দ্বের ফল রাজপথে প্রকাশ পেতে পারে। অন্যদিকে, ঋণ ও ঘাটতি উপেক্ষা করে সব খাতে ব্যয় বাড়ানোরও বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই ফ্রান্সের সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে শুধু অর্থের অভাব নয়, বরং সীমিত সম্পদ কীভাবে বন্টন করা হবে, সেই প্রশ্ন। এই বিতর্কে সামরিক ব্যয়ের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ছাত্র সংগঠনের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে, দেশের প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা যখন রয়েছে, তখন বিদ্যালয়গুলিতে পর্যাপ্ত শিক্ষক, নিরাপদ ভবন এবং উন্নত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন? ফ্রান্সের ২০২৪ থেকে ২০৩০ সালের সামরিক পরিকল্পনার আওতায় মোট ৪১৩৩ কোটি নয়, বরং ৪১৩.৩ বিলিয়ন ইউরো—অর্থাৎ ৪১ হাজার ৩৩০ কোটি ইউরো—বরাদ্দের কথা রয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে কোনও একটি বছরের শিক্ষা বাজেটের সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়; দুই ক্ষেত্রের সময়সীমা এবং ব্যয়ের ধরন আলাদা। তবু প্রশ্নটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলতে কি কেবল সামরিক নিরাপত্তাকে বোঝানো হবে, নাকি শিক্ষিত, সুস্থ ও সামাজিকভাবে সুরক্ষিত নাগরিক সমাজও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ?

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই প্রশ্ন নতুন নয়। ২০১৮ সালে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শুরু হওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর সামাজিক প্রতিবাদে রূপ নিয়েছিল। আন্দোলনের প্রথম দিকে জ্বালানির ওপর কর এবং পরিবেশ বান্ধব অর্থনৈতিক রূপান্তরের ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয় গ্রামীণ ও ছোট শহরের মানুষের বঞ্চনা, ক্রয়ক্ষমতার অবনতি এবং প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ। বহু আন্দোলনকারী মনে করেছিলেন, পরিবেশ রক্ষার নীতির আর্থিক বোঝা তাঁদের ওপর চাপানো হচ্ছে, অথচ উচ্চ আয়ের মানুষ ও বড় সম্পদশালীদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে নরম। এই আন্দোলন ফরাসি রাজনীতিতে একটি স্থায়ী প্রশ্ন রেখে যায়: অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল কারা পাচ্ছেন এবং তার মূল্য কারা দিচ্ছেন? মাক্রোঁর সমর্থকেরা তাঁকে আধুনিকীকরণ ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রবক্তা হিসেবে দেখলেও সমালোচকেরা তাঁর নীতিকে ধনীদের প্রতি অনুকূল এবং শ্রমজীবী মানুষের সমস্যার প্রতি অসংবেদনশীল বলে চিহ্নিত করেছেন। হলুদ জ্যাকেট আন্দোলন দেখিয়েছিল, কোনও আন্দোলনের সূচনা একটি নির্দিষ্ট নীতির বিরুদ্ধে হলেও তার মধ্যে বহু বছরের সামাজিক ক্ষোভ জমা থাকতে পারে। চলমান বিক্ষোভেও একই ধরনের বিস্তার দেখা যাচ্ছে।

২০২৩ সালে অবসরের বয়স ৬২ থেকে ৬৪ বছরে উন্নীত করার পেনশন সংস্কার ঘিরেও ফ্রান্সে ব্যাপক ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়েছিল। সরকারের যুক্তি ছিল, জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সঙ্গে পেনশন ব্যবস্থার আর্থিক স্থায়িত্ব বজায় রাখতে সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু শ্রমিক সংগঠন এবং আন্দোলনকারীদের বক্তব্য ছিল, এর ফলে শ্রমজীবী মানুষকে দীর্ঘদিন কাজ করতে হবে, বিশেষত শারীরিক পরিশ্রম নির্ভর পেশার কর্মীদের ওপর বোঝা বাড়বে। সংসদীয় প্রক্রিয়া এবং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। পেনশন আন্দোলন দেখিয়েছিল, ফরাসি সমাজে কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা এখনও কতটা শক্তিশালী। নাগরিকদের একাংশ মনে করেন, দীর্ঘ কর্মজীবনের পর সম্মানজনক অবসর, চিকিৎসা এবং সামাজিক সুরক্ষা কোনও সরকারি অনুগ্রহ নয়, বরং নাগরিক অধিকারের অংশ। সেই অধিকার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে তারা ধর্মঘট ও গণবিক্ষোভের পথে নামেন। আজ শিক্ষার সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে এই পুরনো বিতর্কের যোগসূত্র রয়েছে।

অর্থনৈতিক অসন্তোষের পাশাপাশি ফ্রান্সে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের আরেকটি গভীর সংকট রয়েছে—পুলিশের ক্ষমতা এবং তার জবাবদিহিতা । বর্তমান আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার, গ্রেপ্তার এবং কিশোর বিক্ষোভকারীদের আহত হওয়ার ঘটনা নতুন করে এই বিতর্ককে সামনে এনেছে। সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য, হিংসাত্মক গোষ্ঠী, অগ্নিসংযোগকারী এবং লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলির উদ্বেগ, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারী এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের সীমা কোথায় থাকবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া, সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া কিংবা বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করা এবং আগুন লাগানো, দোকান লুট করা বা কাউকে আক্রমণ করা এক বিষয় নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারও রক্ষা করা। যদি হিংসাত্মক কাজের দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে গোটা আন্দোলনকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে প্রকৃত অভিযোগগুলি আড়ালে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার আন্দোলনের নামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটকে ন্যায্যতা দেওয়া হলেও সাধারণ নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়।

ফ্রান্সে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের সাম্প্রতিক ইতিহাসও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৩ সালের জুনে প্যারিসের উপকণ্ঠ নঁতেরে ১৭ বছরের নাহেল মারজুক পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। ঘটনার ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়। নাহেলের মৃত্যু বিশেষত অভিবাসী বংশোদ্ভূত তরুণদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কে সামনে নিয়ে আসে। তাঁদের একাংশের অভিযোগ, পরিচয় ও বসবাসের এলাকার কারণে তারা পুলিশের সন্দেহ, তল্লাশি এবং বলপ্রয়োগ এর মুখে অসমভাবে পড়েন। গত সেপ্টেম্বরে প্রস্তাবিত একটি পুলিশি আইনও এই বিতর্ককে আরও তীব্র করে। আল জাজিরার ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবটির সমালোচকেরা আশঙ্কা করেছিলেন, কর্তব্যরত অবস্থায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে পুলিশ ও জঁদার্মের (ফরাসি সামরিক পুলিশ বাহিনী) আত্মরক্ষার দাবিকে বিশেষ আইনি সুবিধা দেওয়া হলে পুলিশি গুলির ঘটনায় জবাবদিহি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। প্রস্তাবটির বিরোধীরা একে কার্যত পুলিশের জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষা বলে বর্ণনা করেন। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আইনের শাসনের প্রশ্ন। পুলিশের হাতে বলপ্রয়োগের ক্ষমতা থাকা রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতার সঙ্গে স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা থাকা দরকার। পুলিশ যদি মনে করে যে তাদের কাজের বিচার কার্যত হবে না, তাহলে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার পুলিশের ওপর হামলা বা তাদের জীবন বিপন্ন করার ঘটনাকে উপেক্ষা করলেও আইনের শাসন দুর্বল হয়। তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুলিশি ক্ষমতা ও নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ভারসাম্য আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্দোলনে কিশোর ও তরুণদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। লে মঁদ এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের অবরোধ, পুলিশি অভিযানের সময় সংঘর্ষ এবং শিক্ষা কর্মীদের আহত হওয়ার কথা উঠে এসেছে। চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ফরাসি সরকারের প্রতিক্রিয়ায় দ্বৈততা দেখা যাচ্ছে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু ছাত্রছাত্রীদের উদ্বেগ স্বীকার করে আলোচনার উদ্যোগ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। অন্যদিকে, সরকার অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও পুলিশি সংঘর্ষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অক্টোবরের শুরুতে গুরুতর আহত এক শিক্ষার্থীর ঘটনার পর ছাত্র বিক্ষোভে গ্রেনেড ব্যবহারের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞার কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার পরিকাঠামো ও শিক্ষক নিয়োগের জন্য কতটা অতিরিক্ত অর্থ বাস্তবে বরাদ্দ করা হবে, তা নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে।

সরকারের সামনে এখন কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণ। রাষ্ট্রের আর্থিক ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখা, ইউরোপীয় আর্থিক কাঠামোর মধ্যে দায়িত্ব পালন এবং নাগরিকদের সামাজিক পরিষেবা দেওয়া—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। কিন্তু সেই ভারসাম্য যদি কেবল বাজেটের অঙ্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তাহলে সামাজিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব উপেক্ষিত হতে পারে। একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক না থাকলে, একটি দরিদ্র পরিবার সন্তানকে উন্নত শিক্ষার সুযোগ দিতে না পারলে কিংবা একজন শ্রমিকের আয় দিয়ে মাসের খরচ মেটানো কঠিন হলে তার প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে তা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতাকেও প্রভাবিত করে। ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করেছে সংসদীয় অস্থিরতা। ২০২৪ সালের আগাম নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর শিবির জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। এর পরবর্তী সময়ে সরকার গঠন, বাজেট অনুমোদন এবং রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে অস্থিরতা অব্যাহত থাকে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের ফ্রান্স-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্যবিরোধী বড় বিক্ষোভ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি আস্থার অবনতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ছাত্র আন্দোলন কেবল শিক্ষা মন্ত্রকের কাছে দাবি পেশ করার বিষয় থাকছে না; তা দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি বৃহত্তর অনাস্থারও প্রকাশ হয়ে উঠছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে থাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি আন্দোলনের ব্যাখ্যা নিজেদের মতো করে তুলে ধরতে চাইছে। বামপন্থী দলগুলি সামাজিক বৈষম্য ও সরকারি পরিষেবার ঘাটতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে; অন্যদিকে দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি আইনশৃঙ্খলা, অভিবাসন এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে সামনে আনছে। কিন্তু আন্দোলনের সব অংশগ্রহণকারীকে কোনও একটি রাজনৈতিক শিবিরের সমর্থক হিসেবে দেখা ভুল হবে। ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সাধারণ নাগরিকদের দাবি এক নয়, যদিও তাদের অসন্তোষের কিছু সাধারণ উৎস রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার সময় তিনি নিজেকে পুরনো দলীয় রাজনীতির বাইরে একজন সংস্কারক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। অর্থনীতিকে আধুনিক করা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ফ্রান্সকে ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ছিল তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তার শাসনকালের বিভিন্ন সংস্কার—বিশেষত পেনশন, শ্রমনীতি এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে সিদ্ধান্ত—সমাজের একাংশের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করেছে যে সংস্কারের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। তরুণদের একাংশের হতাশা সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক দূরত্বেরই প্রতিফলন।

তবে বর্তমান সংকটের জন্য এককভাবে একজন প্রেসিডেন্ট কে দায়ী করলে ফরাসি সমাজের কাঠামোগত সমস্যাগুলি আড়ালেই থেকে যাবে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিবর্তন, শহর ও উপশহরের বৈষম্য, শিক্ষার সুযোগের অসম বণ্টন, শ্রমবাজারের অনিশ্চয়তা এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার চাপ—এই সবকিছুর প্রভাব রয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক মেরুকরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, যেখানে প্রতিপক্ষের বক্তব্য শোনা বা আপসের পথ খোঁজার বদলে প্রতিটি বিরোধকে ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখা হয়। গণতন্ত্রের পক্ষে এই প্রবণতা বিপজ্জনক, কারণ সামাজিক অসন্তোষের সমাধান তখন নীতিনির্ধারণের বদলে সংঘর্ষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

ফ্রান্সের ঘটনাবলির আন্তর্জাতিক তাৎপর্যও রয়েছে। দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান সদস্য, রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ফরাসি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ইউরোপীয় রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের পর প্রতিবেশী বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে শিক্ষা ব্যয় ও উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ নিয়ে তরুণদের প্রতিবাদের খবর প্রকাশিত হয়েছে। যদিও দুই দেশের আন্দোলনের পরিস্থিতি ও কারণ এক নয়, এই ঘটনা দেখায় যে জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি পরিষেবা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ইউরোপের বিভিন্ন সমাজে রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে।

ভারতের মতো দেশের কাছে ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং আধুনিক পরিকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হলেও উন্নয়নের সাফল্য বিচার করতে গেলে শিক্ষার গুণমান, সরকারি বিদ্যালয়ের অবস্থা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সামাজিক বৈষম্যের দিকগুলিও বিবেচনা করতে হয়। কোনও দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হলেই তার সব নাগরিক সমান সুযোগ পান না। রাষ্ট্রের আর্থিক নীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধান বাড়লে উন্নয়নের পরিসংখ্যান রাজনৈতিক সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে পারে না। ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি আরও একটি শিক্ষা দেয়: তরুণদের অসন্তোষকে শুধু শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখা বিপজ্জনক। শিক্ষার্থীদের দাবি ভুল হতে পারে, তাদের আন্দোলনের কৌশলও বিতর্কিত হতে পারে; কিন্তু তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কে গুরুত্ব না দিলে সেই ক্ষোভ আরও গভীর হতে পারে। বিশেষ করে যেসব তরুণ মনে করেন, শিক্ষা তাঁদের সামাজিক উন্নতির প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারছে না, তাঁদের কাছে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন করা জরুরি। তার জন্য কেবল আলোচনা সভা বা আশ্বাস যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষক নিয়োগ, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষায় ন্যায্য সুযোগ এবং সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা।

ফ্রান্সের রাজপথে জ্বলতে থাকা আগুন তাই একই সঙ্গে সতর্কবার্তা ও সম্ভাবনার প্রতীক। সতর্কবার্তা এই কারণে যে, দীর্ঘদিনের সামাজিক অসন্তোষকে অবহেলা করলে একটি সমৃদ্ধ গণতন্ত্রেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়তে পারে। সম্ভাবনা এই কারণে যে, ব্যাপক গণবিক্ষোভ রাষ্ট্রকে তার নীতির সীমাবদ্ধতা নতুন করে পর্যালোচনা করতে বাধ্য করতে পারে। ইতিহাসে ফ্রান্সের সামাজিক আন্দোলন বহুবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। কিন্তু বর্তমান আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কী ফল দেবে, তা নির্ভর করবে সরকার বাস্তব সংস্কারের পথে এগোয় কি না, রাজনৈতিক দলগুলি সামাজিক সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেয় কি না এবং আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক চাপ বজায় রাখতে পারেন কি না, তার ওপর। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে ফ্রান্সের রাস্তায় কতগুলি গাড়ি পুড়ল, কতগুলি দোকান ভাঙচুর হল কিংবা কতজনকে গ্রেপ্তার করা হল। আসল প্রশ্ন, কেন এত বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে রাজপথে নামছেন? কেন বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মনে হচ্ছে, তাঁদের কথা শোনা হচ্ছে না? কেন সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে এত তীব্র সংঘাত তৈরি হয়েছে? আর কেন রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক ক্রমশ আস্থার পরিবর্তে সন্দেহ ও সংঘর্ষের দিকে এগোচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর শুধু পুলিশের সংখ্যা বাড়িয়ে কিংবা কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে বাজেটের স্থিতিশীলতার পাশাপাশি নাগরিকের মর্যাদা, শিক্ষার অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সমান সুযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ফরাসি প্রজাতন্ত্রের মূলমন্ত্র—স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব—কেবল সরকারি ভবনের দেওয়ালে লেখা থাকলে চলবে না; তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে হবে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, কর্মক্ষেত্রে, দরিদ্র পরিবারের জীবনে এবং পুলিশের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কেও। ফ্রান্সের আগুন নেভানোর প্রকৃত উপায় তাই শুধু রাজপথের হিংসা বন্ধ করা নয়; সেই আগুনের পেছনে জমে থাকা সামাজিক ক্ষোভের কারণগুলি সমাধান করা। রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা ও সামাজিক পরিষেবায় বাস্তব উন্নতি ঘটাতে পারে, তাহলে বর্তমান সংকট গণতন্ত্রের পুনর্গঠনের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি ক্ষোভের জবাব কেবল দমন, গ্রেপ্তার এবং প্রতিশোধের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আজকের আগুন সাময়িকভাবে নিভলেও তার নিচে জমে থাকা অসন্তোষ আবারও বিস্ফোরিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, দিল্লি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪