| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ইনানী জাতীয় উদ্যানে মেঘলা চিতা, মিলল আরও ২১ প্রজাতির প্রাণী

reporter
  • আপডেট টাইম: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ ইং | ১০:৫৪:৩১:পূর্বাহ্ন  |  ২৭৫৮ বার পঠিত
ইনানী জাতীয় উদ্যানে মেঘলা চিতা, মিলল আরও ২১ প্রজাতির প্রাণী

স্টাফ রিপোর্টার: কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে প্রথমবারের মতো ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে বিরল ও বিপন্ন মেঘলা চিতা। ১৩ মাসের গবেষণায় বনের তিনটি ক্যামেরায় প্রাণীটির পাঁচটি ছবি পাওয়া গেছে। শুধু মেঘলা চিতাই নয়, গবেষণায় আরও ২১ প্রজাতির বন্য প্রাণীর উপস্থিতিও নিশ্চিত করেছেন গবেষকেরা। বন উজাড়, দখল ও মানুষের চাপের মধ্যে এই আবিষ্কার কক্সবাজারের বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

এ মাসের শুরুতে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন’-এ এ-সংক্রান্ত গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।

গবেষণা দলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত টানা ১৩ মাস কক্সবাজারের একটি সংরক্ষিত বনে গবেষণা চালানো হয়। ইনানী জাতীয় উদ্যানের ৩২টি স্থানে ১৫টি ক্যামেরা বসিয়ে বন্য প্রাণীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে তিনটি ক্যামেরায় মেঘলা চিতার পাঁচটি ছবি ধরা পড়ে। পাশাপাশি পায়ের ছাপ ও মল পরীক্ষা করেও প্রাণীটির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

বন অধিদপ্তরের বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিপুল কৃষ্ণ দাস জানান, ইনানী জাতীয় উদ্যানের আয়তন ৭ হাজার ৮৫ হেক্টর। গবেষণায় দেখা গেছে, এর প্রায় ৩ হাজার হেক্টর এলাকা মেঘলা চিতার বসবাসের উপযোগী। অর্থাৎ উদ্যানের প্রায় ৪৪ শতাংশ এলাকায় প্রাণীটির উপযুক্ত আবাসস্থল রয়েছে।

গবেষকেরা বলছেন, গাছের সঙ্গে থাকা ঘন ঝোপঝাড়সমৃদ্ধ এলাকায় মেঘলা চিতার উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। এমন বনাঞ্চলের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৮৮৭ হেক্টর। আবার যেখানে জলাশয়, পাহাড়ি ছড়া ও পানির প্রবাহ রয়েছে, সেসব এলাকায় অন্যান্য অংশের তুলনায় বন্য প্রাণীর উপস্থিতিও বেশি।

বিলুপ্তির ঝুঁকিতে মেঘলা চিতা

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনভূমিতে পাওয়া যায় মাঝারি আকারের এই মাংসাশী প্রাণী। শরীরে মেঘের মতো বড় বড় ছোপ থাকায় এর নাম মেঘলা চিতা। দিনের বড় একটি সময় গাছের ওপর কাটানো এই প্রাণীর প্রধান শিকারের মধ্যে রয়েছে বানর, পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী।

গাছের জীবনযাপনের সঙ্গে মেঘলা চিতার শরীরও বিশেষভাবে অভিযোজিত। এর গোড়ালির সন্ধি অত্যন্ত নমনীয় হওয়ায় প্রায় ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরতে পারে। ফলে গাছের খাড়া কাণ্ড বেয়ে মাথা নিচের দিকে রেখেও নেমে যেতে পারে প্রাণীটি।

প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের জাতীয় পর্যায়ের মূল্যায়নে বাংলাদেশে মেঘলা চিতাকে মহাবিপন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৈশ্বিকভাবে প্রাণীটি আইইউসিএনের লাল তালিকায় ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে রয়েছে।

বন্য প্রাণী গবেষক রেজা খান বলেন, মেঘলা চিতা অত্যন্ত বিরল প্রাণী। ইনানীর বনে এর উপস্থিতি প্রমাণ করে, বনটির কিছু অংশ এখনো সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র ধরে রেখেছে। প্রাণীটির আবাসস্থল চিহ্নিত করে বিশেষ সংরক্ষণব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তার মতে, ইনানীর বনে কাঠ আহরণ বন্ধ করার পাশাপাশি সেখানে কোনো অবৈধ বসতি থাকলে তা সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

ইনানীতে মিলেছে আরও ২১ প্রজাতি

মেঘলা চিতার পাশাপাশি গবেষণায় ইনানী জাতীয় উদ্যানে আরও ২১ প্রজাতির বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে এশিয়ান হাতি, মুখপোড়া হনুমান, উল্টোলেজি বানর, লজ্জাবতী বানর, রেসাস মেকাক, শজারু, শিয়াল, গন্ধগোকুল, ছোট ও বড় খাটাশ, বনবিড়াল, চিতা বিড়াল, বন্য শূকর, কাঁকড়াভুক বেজি, গোরখোদক, ইরাবতী কাঠবিড়ালি, গেছো চুছো, মায়া হরিণ, দাঁতাল ফেরেট বেজার, ছোট রক্তপেকো বাদুড়, বাদামি কাঠবিড়ালি ও লাল উড়ন্ত কাঠবিড়ালি।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছে বন অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ এবং জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব গেটিনয়েন।

বন দখল ও মানুষের চাপে হুমকিতে আবাসস্থল

গবেষণায় ইনানী জাতীয় উদ্যানের চারপাশে বন্য প্রাণীর জন্য বেশ কয়েকটি বড় হুমকি চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষের বসতি, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের সম্প্রসারণ, গাছ কেটে জ্বালানি সংগ্রহ এবং কৃষিজমির জন্য বনভূমিতে অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে প্রাণীদের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের আনাগোনা বেশি এমন এলাকা এবং কৃষিনির্ভর অঞ্চলে বন্য প্রাণীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে কম।

বন্য প্রাণী সংরক্ষণে গবেষকেরা কয়েকটি সুপারিশও করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বনভূমিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও দখল বন্ধ করা, পাহাড়ি ছড়া ও খাল রক্ষা করা এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ সচল রাখা। পাশাপাশি উদ্যানের চারপাশে বাফার জোন তৈরি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গবেষকদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ইনানী জাতীয় উদ্যানের উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য এবং বিরল স্তন্যপায়ী প্রাণীদের অনেক প্রজাতি ভবিষ্যতে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

আর ইনানীর বনে মেঘলা চিতার উপস্থিতি সেই বিপদের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—মানুষের চাপ বাড়লেও বনটির কিছু অংশ এখনো বন্য প্রাণীদের টিকে থাকার মতো পরিবেশ ধরে রেখেছে।

রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ 

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪