| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

রাস্তায় সারবোঝাই ট্রাক, গুদামেও মজুত—তবু কৃষকের হাতে সার নেই

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ০৫, ২০২৬ ইং | ০৬:৪৭:৩৯:পূর্বাহ্ন  |  ১৭৭ বার পঠিত
রাস্তায় সারবোঝাই ট্রাক, গুদামেও মজুত—তবু কৃষকের হাতে সার নেই

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: ঠাকুরগাঁওয়ের মাদারগঞ্জ বিএডিসি সার গুদামের সামনে সারবোঝাই ৫৮টি ট্রাক দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে আছে। গুদামের ধারণক্ষমতা ২ হাজার ১০০ মেট্রিক টন হলেও সেখানে রয়েছে প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন সার। জায়গা না থাকায় ট্রাক থেকে সার খালাস করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে মাঠে সার না পেয়ে কৃষকদের একাংশকে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। ফলে গুদাম ও ট্রাকে সার থাকলেও কৃষকের জমিতে তৈরি হয়েছে সংকট।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে ঠাকুরগাঁওয়ে ইউরিয়ার চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ কমেছে ১২ হাজার ৫৪৭ মেট্রিক টন। টিএসপিতে ঘাটতি ৩৪ হাজার ৩৯০ মেট্রিক টন এবং এমওপিতে ৬ হাজার ৫৪৭ মেট্রিক টন। জিপসামের ক্ষেত্রেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে ৯ হাজার ৭৯৫ মেট্রিক টন। তবে ডিএপিতে চাহিদার চেয়ে ১৭ হাজার ১৩২ মেট্রিক টন বেশি বরাদ্দ রয়েছে। কৃষক ও ডিলারদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দের পাশাপাশি সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় জটিলতার কারণেই সংকট তীব্র হয়েছে।

মাদারগঞ্জ বিএডিসি সার গুদামের সহকারী হিসাব কর্মকর্তা মো. আহাদ জানান, গুদামের ধারণক্ষমতা ২ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। অক্টোবর মাসে নন-ইউরিয়া সার বরাদ্দ এসেছে ৯ হাজার ৫৫৯ মেট্রিক টন। বর্তমানে মজুত রয়েছে প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে টিএসপি ২ হাজার ৯২১, এমওপি ২ হাজার ৪০ এবং ডিএপি ২ হাজার ৭ মেট্রিক টন রয়েছে। গুদামের সামনে আরও ৫৭টি সারবোঝাই ট্রাক খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ডিলারদের মধ্যে বরাদ্দের বিভাজন না করায় ট্রাকগুলো খালাস করা যাচ্ছে না বলে গুদাম কর্তৃপক্ষের দাবি।

ঠাকুরগাঁওয়ে বিএডিসির ১৪৮ এবং বিসিআইসির ৬২ জন ডিলারের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ করা হয়। গুদাম কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, মজুত সার ডিলারদের মধ্যে দ্রুত বিভাজন করে দেওয়া গেলে গুদামের জায়গা খালি হবে এবং বাইরে অপেক্ষমাণ ট্রাকগুলোর সারও খালাস করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃষকের কাছেও সরবরাহ বাড়ানো যাবে।

তবে কৃষি বিভাগের বক্তব্য ভিন্ন। ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মাজেদুল ইসলাম বলেন, অক্টোবর মাসের বরাদ্দ ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে অগ্রিম উত্তোলনের নির্দেশনা থাকলেও ঠাকুরগাঁওয়ে তা তোলা হয়নি। তাঁর দাবি, এটি বাধ্যতামূলক নির্দেশনা ছিল না। সেপ্টেম্বর মাসে অতিরিক্ত বরাদ্দ হিসেবে ২ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি ও ১ হাজার মেট্রিক টন এমওপি দেওয়া হয়েছে। অক্টোবরের নিয়মিত বরাদ্দ ৭ থেকে ৮ অক্টোবরের দিকে ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর দাবি, ডিলারদের কাছে আগের বরাদ্দের সার পর্যাপ্ত রয়েছে এবং তা কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

কিন্তু মাঠের চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কৃষকেরা। সদর উপজেলার নারগুন কহরপাড়া গ্রামের কৃষক মামুনুর রশীদ বলেন, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫০ টাকার টিএসপির বস্তা তাঁকে ১ হাজার ৫৫০ টাকায় এবং একই দামের ইউরিয়া ১ হাজার ৬০০ টাকায় খোলা বাজারে গোপনে কিনতে হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কৃষি কর্মকর্তারা সারের প্রয়োজন নেই বললেও আমন ধান ও শাকসবজির জন্য এ সময়ে সারের প্রয়োজন রয়েছে। বেগুনবাড়ি এলাকার কৃষক মনসুর আলীর অভিযোগ, খোলাবাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে না। পরিচিত কৃষকদের গোপনে সার দেওয়া হলেও সাধারণ কৃষকেরা তা পাচ্ছেন না। তিনি ইউরিয়ার এক বস্তার জন্য ১ হাজার ৫৫০ টাকা দিয়েছেন বলে জানান।

একই এলাকার কৃষক ইউসুফ আলীর ৩০ বিঘা জমি। তাঁর হিসাবে, আমন মৌসুমের শেষ পর্যায়ে শুধু টিএসপিই তাঁর অন্তত ছয় বস্তা প্রয়োজন। কিন্তু এনআইডি জমা দিয়ে তিনি পেয়েছেন মাত্র এক বস্তা। তাঁর অভিযোগ, ডিলাররা মাসে একদিন সার দিতে আসেন, সেদিন হাজারো কৃষক লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য সার পান। তাঁর প্রশ্ন, চাহিদার তুলনায় কম সার কৃষকদের দেওয়ার পর বাকি সার কোথায় যাচ্ছে—এ বিষয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

ডিলারদের পক্ষ থেকেও বরাদ্দের স্বল্পতার অভিযোগ রয়েছে। সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার রাজিউর রহমান জানান, গত সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ৪১ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৭ মেট্রিক টন টিএসপি, ১২ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন ডিএপি এবং সাড়ে ৭ মেট্রিক টন এমওপি পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, মাঠের চাহিদার তুলনায় এ বরাদ্দ একেবারেই পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, কৃষকের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। বরাদ্দ না বাড়িয়ে ডিলার বাড়ানোর চেয়ে বিদ্যমান ডিলারদের বরাদ্দ বাড়ানোই কার্যকর সমাধান হতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণেও বরাদ্দ ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট। চলতি অর্থবছরে জেলায় ইউরিয়ার চাহিদা ৭৮ হাজার ৫৪৪ মেট্রিক টন হলেও বরাদ্দ ৬৫ হাজার ৯৯৭ মেট্রিক টন। টিএসপির চাহিদা ৫৬ হাজার ৩১০ মেট্রিক টন, বরাদ্দ মাত্র ২১ হাজার ৯২০ মেট্রিক টন। এমওপির চাহিদা ৩৬ হাজার ৫৪৭ মেট্রিক টন, বরাদ্দ ৩০ হাজার মেট্রিক টন। জিপসামের চাহিদা ১১ হাজার ৭০৯ মেট্রিক টনের বিপরীতে বরাদ্দ ১ হাজার ৯১৪ মেট্রিক টন। তবে ডিএপির ক্ষেত্রে চাহিদা ২৫ হাজার ৩৩৫ মেট্রিক টন হলেও বরাদ্দ ৪২ হাজার ৪৬৭ মেট্রিক টন।

সারের সংকটের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে পরিবহন জট। মাদারগঞ্জ গুদামের সামনে ৫ থেকে ৯ দিন ধরে সারবোঝাই ট্রাক নিয়ে অপেক্ষা করছেন চালকেরা। যশোরের নওয়াপাড়া থেকে সার নিয়ে আসা আব্দুল ওহাব পাঁচ দিন, শরিফুল ইসলাম নয় দিন এবং মাহমুদ মিজান ছয় দিন ধরে অপেক্ষা করছেন বলে জানান। তাঁদের অভিযোগ, গুদামে জায়গা ও শ্রমিক সংকটের কারণে সার খালাস করা হচ্ছে না। অথচ গুদামে জায়গা না থাকলে বা চাহিদা না থাকলে নওয়াপাড়া থেকে এত সার পাঠানো হলো কেন—এ প্রশ্নেরও জবাব চান তাঁরা।

ট্রাকচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, তিনি গুদামে এসে দেখেন তাঁর গাড়ির সিরিয়াল ২৭ নম্বরে। প্রায় পাঁচ দিন ধরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করেও খালাসের সুযোগ পাননি। রকিবুল নামে আরেক চালকের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় গাড়ি লোড অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকায় প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ হাজার টাকা দামের টায়ার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গাড়ি বন্ধ থাকায় ব্যাটারিও নষ্ট হচ্ছে। মুসা নামে এক চালক জানান, খুলনা থেকে সার নিয়ে এসে তাঁদের গাড়ি ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত বসিয়ে রাখা হচ্ছে। অথচ এ সময়ের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ বা ড্যামারেজ দেওয়া হচ্ছে না। চালক ও সহকারীদের থাকা-খাওয়ারও কোনো ব্যবস্থা নেই।

এদিকে কৃষি বিভাগের দাবি, মাঠে সারের যে সংকটের কথা বলা হচ্ছে, তার একটি অংশ কৃত্রিম চাহিদা। উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, এক কৃষকের বাড়ি থেকে ৪৫ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে। লাইনে কৃষকের পাশাপাশি সুযোগসন্ধানী অকৃষকের উপস্থিতিও রয়েছে। নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়া বা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তবে কৃষক মনসুর আলী এ বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, বর্তমানে চিকন ধান ব্রি-৩৪সহ বিভিন্ন ফসলে সারের প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর মতে, মাঠে সারের প্রয়োজন না থাকলে কৃষকেরা অতিরিক্ত দামে সার কিনতে বাধ্য হতেন না।

ঠাকুরগাঁও সুশাসনের জন্য নাগরিক কমিটির সভাপতি (সুজন) আব্দুল লতিফ বলেন,একদিকে গুদামে রয়েছে বিপুল পরিমাণ সার, অন্যদিকে গুদামের বাইরে সারবোঝাই ট্রাকের দীর্ঘ সারি। আবার মাঠে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন কৃষকেরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাহিদার তুলনায় ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও জিপসামের ঘাটতি। ফলে শুধু সার আছে কি না—এই প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে সেই সার কোথায়, কীভাবে এবং কত দামে পৌঁছাচ্ছে—এই প্রশ্নই।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪