| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা জরুরি: আইএমএফ

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ১৫, ২০২৬ ইং | ১০:৩৭:৪৪:পূর্বাহ্ন  |  ১১৪৪৯ বার পঠিত
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা জরুরি: আইএমএফ

রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্বস্তি দিতে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু এ পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।

আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র।

সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সোনালি জৈন চন্দ্র বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর পাশাপাশি অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও সংস্কার কার্যক্রম চালাতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং মূল্যস্ফীতিএই তিনটি বিষয় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল সুদের হার বা মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে আর্থিক খাতের সংস্কার এবং সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, দেশের আর্থিক খাত অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে খাতটির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

আর্থিক খাতের দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের পরিবর্তে কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফের মতে, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।

সংস্থাটির দৃষ্টিতে, আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে। অর্থনীতির ওপর বিদ্যমান চাপ মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে আর্থিক খাতের সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে আইএমএফ।

এ ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতা, বাস্তবায়নের কার্যকারিতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকেও আরও শক্তিশালী করতে হবে।

বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের দুর্বল পরিস্থিতিও আইএমএফের উদ্বেগের অন্যতম প্রধান কারণ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বর্তমানে এ অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর মধ্যে অন্যতম।

রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বলতে একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় সরকারের সংগৃহীত রাজস্বের পরিমাণকে বোঝায়। এ অনুপাত কম থাকলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা, প্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় নির্বাহ এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আইএমএফের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার জন্য সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য অর্জনে রাজস্ব ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। রাজস্ব আহরণে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন কার্যক্রমের অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং আর্থিক খাতের সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়টি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচিত হলেও আইএমএফের বক্তব্যে বাংলাদেশের বর্তমান রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতের দুর্বলতা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। সংস্থাটির মতে, রাজস্ব ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না এলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা থেকে যেতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়েও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সংস্থাটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র জানিয়েছেন, আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত মে মাসে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ আইএমএফের সহায়তায় নতুন একটি কর্মসূচির অনুরোধ জানায়।

বাংলাদেশের এ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। সফরকালে প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিভিন্ন দিক নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে।

আইএমএফের কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই আলোচনায় উঠে আসা সংস্কারের বিষয়গুলো চলতি বছরের আর্টিকেল ফোর পরামর্শে উল্লেখ করা সুপারিশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য যেসব সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আগে তুলে ধরা হয়েছিল, নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাতেও সেসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।

আর্টিকেল ফোর পরামর্শের আওতায় আইএমএফ সদস্যদেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এবং অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কার বিষয়ে সুপারিশ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

জুলাইয়ে আইএমএফের প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরের পর থেকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংস্থাটির নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সোনালি জৈন চন্দ্র জানান, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইএমএফের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে সংস্থাটি আগ্রহী।

তবে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা চলমান থাকলেও এর চূড়ান্ত কাঠামো, ঋণের পরিমাণ কিংবা অনুমোদনের সময়সীমা সম্পর্কে এ বক্তব্যে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

আইএমএফের সাম্প্রতিক বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং কম রাজস্ব আহরণ বিশেষভাবে সামনে এসেছে। সংস্থাটির অবস্থান অনুযায়ী, এ সমস্যাগুলোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই; বরং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সমন্বিতভাবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আর্থিক খাতের কাঠামোগত সংস্কার এবং সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিশ্বাসযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যে আইএমএফের এ বার্তা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সংস্থাটির বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নতুন কর্মসূচি বা আর্থিক সহায়তার আলোচনার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা দূর করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো এই তিনটি ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ।


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪