| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ছবির মতো গ্রামের নামটি 'কামারগাঁও

reporter
  • আপডেট টাইম: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৫ ইং | ১২:১৬:৫৭:অপরাহ্ন  |  ১৪৯৫৬২৭ বার পঠিত
ছবির মতো গ্রামের নামটি 'কামারগাঁও

এ এইচ সবুজ,গাজীপুর: ছবির মতো ছোট্ট একটি গ্রামের নাম কামারগাঁও। এ গ্রামের পূর্ব দিকে দিয়ে বয়ে চলেছে ব্রহ্মপুত্র নদের উপশাখা বানার নদী। উত্তর অংশে লাল মাটির টেক, দক্ষিণে অর্থাৎ কামারগাঁও পুরাতন বাজারের পাশেই অবস্থান কাপাসিয়া উপজেলার সবচেয়ে বড় 'ঘোরশ্বাব জলমহাল'। যা এই গ্রামের মানুষের কাছে 'ঘোশাবরের গাঙ'নামেই পরিচিত। এই গাঙের চাপিলা মাছের স্বাদ এখনো মানুষের মুখে মুখে। এই গ্রামের পশ্চিম অংশেও রয়েছে লালচে মাটির টেক/ টিলা। 

উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, আমাদের এ গ্রামের নামকরণ নিয়ে রয়েছে ইতিহাস। বাংলার বারো ভূঁইয়াদের আমলের ইতিহাস উৎপ্রোতভাবে জড়িত এই গ্রামের সাথে। বারো ভূঁইয়াদের আমলে যুদ্ধের সকল অস্ত্র তৈরি করতেন কামারগাঁওয়ের কামারগণ।  কাপাসিয়া অঞ্চলের লোহাদী গ্রামের লোহার খনির আকরিক লোহা দিয়েই তৈরি হতো বারো ভূঁইয়াদের যুদ্ধের সকল অস্ত্র। যা দিয়ে তারা যুদ্ধে অংশ নিতেন।

ছোট্ট এই গ্রামের মাঝ দিয়ে চলে গেছে বেশ কয়েকটি পাকা রাস্তা। ঘাস, লতাপাতা,ঝোপঝাড় সর্বত্রই। যেদিকে তাকাই শুধুই সবুজ গাছপালা। এটি আমাদের প্রিয় 'কামারগাঁও'গ্রামের চিত্র।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ঘাগটিয়া ইউনিয়নের সর্ব দক্ষিণে আমাদের গ্রামটির অবস্থান। ইউনিয়ন পরিষদের সামনে দিয়ে পাকা রাস্তাটি কামারগাঁও বাজার থেকে আড়াল বাজার হয়ে কাপাসিয়া সদরে চলে গেছে। এছাড়াও চালা বাজার, সালদৈ বাজার, বাওড় সরকার বাড়ি বাজার, মনোহরদী বাজারেও চলে গেছে পাকা রাস্তা।

এই গ্রামের আদি বাজারটি সম্প্রতি বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে জমজমাট হয়ে উঠেছে কামারগাঁও নামা বাজার এবং বাওড় সরকার বাড়ি বাজার। 

গ্রামের ঠিক মাঝখানে একটি হাইস্কুল আছে। নাম কামারগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়। এটি ১৯৬০ সালে স্থাপিত হওয়ার পর নিম্ন মাধ্যমিক দিয়েই শুরু করেছিল শিক্ষা কার্যক্রম। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে রুপান্তরিত করা হয়। ১৯৭৭ সালেই এ স্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষায় অংশ নেয় ৪৫ জন আর উত্তীর্ণ হয় মাত্র ২ জন। উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীরা হলেন মো: আহমেদুল কবির ও মো: হাবিবুর রহমান।

হাইস্কুলের একই বাউন্ডারিতে অবস্থিত কামারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কামারগাঁও কেন্দ্রীয় ঈদগাহ। এই ঈদগাহে আশপাশের ৪-৫ টি গ্রামের লোকজন ঈদের নামাজ আদায় করতেন। এই গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাইস্কুল সবার মতো আমারও শৈশবের প্রথম প্রেম ও প্রথম পাঠশালা। স্কুল প্রাঙ্গণে আছে দৃষ্টিনন্দন খেলার মাঠ। স্কুল শেষে প্রতিদিন বিকেলে এ মাঠে ফুটবল/ ক্রিকেট খেলতাম। 

ফুটবল ক্রিকেটের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষার খেলার মধ্যে রয়েছে ডাঙ্গুলি, মার্বেল খেলা, দাইরা, মোরগের লড়াই, ফাল চাড়া, ঘুড্ডি উড়ানি, পলামুঞ্জি, বৌ ছি, আয়রে আমার গোলাপ ফুলসহ কত খেলা!

এছাড়াও এই গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১টি, কিন্ডারগার্ডেন স্কুল রয়েছে ৩টি, কওমি মাদ্রাসা রয়েছে ১টি, হাফিজিয়া মাদ্রাসা রয়েছে ৩টি, মহিলা মাদ্রাসা রয়েছে ১টি, কারিগরি কলেজ রয়েছে ১টি।

মনে পড়ে শৈশবের স্মৃতি, সন্ধ্যা নামলেই পড়তে বসতাম। পাটিতে বসে কুপি বা হারিকেনের আলোয় চলতো ধুম পড়ালেখা।সাদাকালো টিভি সবার বাড়িতে ছিলো না কিন্তু রেডিও ছিলো প্রায় মানুষের বাড়িতে। কারণ ঐ সময় রেডিও ছিল বিনোদনের বড় মাধ্যম। তা-ও সবার ঘরে ছিলো না। বিবিসির খবর, পল্লি গানের অনুষ্ঠান 'বাঁশরি', সৈনিক ভাইদের জন্য ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান অনুরোধের আসর 'দুর্বার' এবং ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠানও ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। 

জানা যায়, ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৯৬-৯৮ পর্যন্ত ঐ সময় পুরো গ্রামজুড়ে শুধুমাত্র মুন্সীবাড়ির আ: সালামের বাড়িতে থ্রি ব্যান্ডের একটি রেডিও ছিলো আর মালো (হিন্দু) পাড়ার একজনের বাড়িতে রেডিও ছিলো। বিবিসি বাংলার খবর শোনার জন্য সবাই উল্লেখিত দুই বাড়িতে চলে যেত।

১৯৯৮ সালে ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা দেখার জন্য কামারগাঁও গ্রামের আক্তার ডাক্তার ১৪ ইঞ্চি সাদাকালো টিভি কিনেন। যা বসানো হয় কামারগাঁও টান বাজারে তার নিজস্ব দোকানে। এছাড়া এই গ্রামের কারো বাড়িতে টিভি ছিলো না।

এই গ্রামের পাশের নদী বা বিলের পাড়ে হাঁটাহাঁটি, নৌকায় চড়া, টেক-টিলায় ঘুরে বেড়ানো, পুরনো মাটির ঘর, লতাপাতা আর মাটির ঘ্রাণ যে কাউকে বিমোহিত করে। সবমিলিয়ে আমাদের এই গ্রামটি যেন 'প্রাকৃতিক রিসোর্ট'। যা দেখতে ছবির মতো।

এ গ্রামের প্রায় সব ঘরই মাটির তৈরি। কাঁচা মাটির রাস্তা পাকা হলো বেশ আগে। ১৯৯৪ সালের দিকে অল্প কয়েকটি পাড়ায় বিদ্যুৎ-সংযোগ পাওয়া যায়। পর্যায়ক্রমে পুরো গ্রামের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে গেছে। একসময়ের অবহেলিত গ্রামটি ক্রমেই উন্নতির দিকে হেঁটে চলছে। মাটির ঘরগুলো হচ্ছে দালানকোঠা। গ্রামের অনেকে বিদেশে থাকেন। উন্নতির পেছনে তাঁরা বড় ভূমিকা রাখছেন।

আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে দুরন্তপনায়। বানার নদীতে দল বেঁধে সাঁতার কাটা, ডুবোডুবি খেলা, বানার নদীর পাড়ের গাছ থেকে পানিতে লাফিয়ে পড়ার খেলা ছিল দুরন্তপনার বিশেষ দিক। এছাড়াও দুপুরের তপ্ত রোদে পাখির বাসা খোঁজে বের করা, ফড়িংয়ের লেজে কাঠি ঢুকিয়ে আকাশে ছেড়ে দেওয়ার মতো অমানবিক কাজও তখন করেছি।

অবহেলিত এই গ্রামকে শতভাগ শিক্ষিত এই গ্রামে রুপান্তরিত করেছেন এমন কিছু প্রসিদ্ধ ব্যক্তির জন্ম হয়েছিল এই গ্রামে। যারা এই গ্রামের আলো বাতাসে শৈশব-কৈশোর পার করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম পীরে কামেল অবসরপ্রাপ্ত ডিইও মরহুম মৌলভী শামসুর রহমান, মরহুম মাওলানা মোঃ ইসহাক মৌলভী, ফজর আলী প্রধান, আব্দুল আলী প্রধান, আব্দুস সালাম পন্ডিত, আব্দুস সিদ্দিক পন্ডিত, মমতাজ উদ্দিন মেম্বার, আহছান উল্লাহ ফকিরসহ আরো অনেকে।

কামারগাঁও গ্রামের প্রথম পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী ব্যক্তি হলেন মৌলভী শামসুর রাহমানের দ্বিতীয় ছেলে প্রফেসর আব্দুল্লাহ্ আল মামুন। যিনি জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ময়মনসিংহের শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডীন হিসেবে চাকরি জীবন শেষ করেন।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডীন প্রফেসর আব্দুল্লাহ্ আল মামুন এর লেখা কৃষির ওপর ইংরেজিতে অনূদিত একটি বই জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়েছিল।

এ গ্রামে জন্ম নেয়া অনেকেই উচ্চ শিক্ষিত হয়ে আলো ছড়াচ্ছেন দেশের বিভিন্ন জায়গায়। একই সাথে গ্রামের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

তবে আধুনিকতার এই সময়ে গ্রামের উঠতি বয়সি কেউ কেউ বিপথে হাঁটছে। এরা বখাটেপনা, ধূমপান, মোবাইলে অ্যাপস দিয়ে জুয়া খেলা ও মোবাইল অপব্যবহারে লিপ্ত। কিছু তরুণ লেখাপড়া ছেড়ে হচ্ছে বিদেশমুখী। আবার কেউবা ধরেছেন পরিবারের হাল। 

তবে দলমতের ঊর্ধ্বে আমরা সবাই আমাদের গ্রামকে ভালোবাসি।এ গ্রামের উন্নয়নে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ।

জীবিকার তাগিদে আজ আমি নগরে। কিন্তু মনটা পড়ে থাকে গ্রামেই। ঘুড়ির নাটাইয়ের মতো আমাকে টানে বাড়ির আঙিনায় জন্মানো টাটকা সবজি-ফল, বিলে ধরা কৈ-ট্যাংরা-পুঁটি, মা-বাবার মমতা, বউ কথা কও পাখির গান, কাঠবিড়ালির লম্ফঝম্প, আরো কত-কী!

জন্মের পর প্রথম নিশ্বাস এ গ্রামেই। পরম মমতায় প্রিয় গ্রাম আমাদের আগলে রেখেছে। আমরা প্রত্যাশিত উন্নত গ্রাম পেয়েছি বটে, তবে এখনো হয়তো হারানো গ্রামকেই আবার খোঁজে ফিরি।

শেষ নিশ্বাসের পর চিরঘুমের ইচ্ছাও এখানেই। ভালো থেকো প্রাণের ভূখণ্ড। প্রিয় গ্রাম আমার।


রিপোর্টার্স২৪/এসএন

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪