রিপোর্টার্স২৪ডেস্ক: “মা, আমরা গরীব দেইখা সবাই টেসে। আমি ইতালি জামু মা… কিন্তু আমি যাইতে দিছি নাই”এভাবেই বুকফাটা কান্নায় কথা বলছিলেন লিবিয়ায় মাফিয়াদের গুলিতে নিহত মাদারীপুরের যুবক মুন্না তালুকদারের (২২) মা রাবেয়া বেগম। তিন ভাই–বোনের বড় মুন্না বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। ১ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ থাকার পর মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) তাঁর মৃত্যুসংবাদ পায় পরিবার। খবর নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই দালালচক্রের সদস্য ও তাদের পরিবার পলাতক।
বুধবার (১৯ নভেম্বর) রাজৈর উপজেলার বদরপাশা ইউনিয়নের পূর্ব দুর্গাবদ্দি গ্রামে গিয়ে দেখা যায় শোকস্তব্ধ পরিবেশ। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে মায়ের বারবার মূর্ছা যাওয়া, বাবার অশ্রু ধরে রাখতে না পারা—সব মিলিয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, আশপাশের অনেকে সাগরপথে ইতালি গিয়ে স্বচ্ছল হয়েছেন। সেই স্বপ্নে মগ্ন হয় মুন্নাও। প্রতিবেশী দালাল নান্নু শেখের মাধ্যমে মাদারীপুর সদর উপজেলার আদিত্যপুর গ্রামের মানবপাচারচক্রের সদস্য শিপন খানের সঙ্গে ২২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। পরে আরও ৩৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। গত ৮ অক্টোবর বাড়ি ছাড়েন তিনি।
১ নভেম্বর লিবিয়া থেকে ২৬ জন বাংলাদেশিকে নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় দলটি। পথিমধ্যে সাগরে মাফিয়াদের গুলিতে মারা যান মুন্না এবং মাদারীপুরের আরও দুই যুবক,কুনিয়া ইউনিয়নের আদিত্যপুর গ্রামের ইমরান খান এবং রাজৈর পৌরসভার ঘোষলাকান্দি গ্রামের বায়েজিত শেখ (১৮)। দালালচক্র পরিবারগুলোকে জানায়, তারা হাসপাতালে ভর্তি। পরে চাপ প্রয়োগে ১৮ দিন পর জানা যায়, তিনজনই নিহত হয়েছেন।
নিহত মুন্নার বাবা ইমারত হোসেন তালুকদার বলেন, ‘জমি বিক্রি কইরা আর সুদে টাকা আনি ছেলেকে পাঠাইছিলাম। ২২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা নিছে দালাল। পরে আর কোনো খবর নাই। দালালের ভাইরে দিয়া চাপ দিলে পরে জানলাম মুন্না মারা গেছে। ও ছাড়া সংসার কীভাবে চলবে? দালালের বিচার চাই। সরকার যেন ছেলের লাশ দেশে আনে।’
মুন্নার মামা আজিজুল হাকিম শেখ বলেন, দালালরা লিবিয়ায় নিয়ে ওদের নির্যাতন করেছে, ঠিকমতো খেতেও দেয় নাই। ১৮ দিন কিছু বলে নাই। তাদের কঠোর শাস্তি চাই। সরকারের কাছে ভাইগ্নার লাশ দেশে আনার দাবি জানাই।
ইমরান খানের পরিবার জানায়, তাকে পাঠাতে ২২ লাখ টাকায় চুক্তির পর লিবিয়ায় নিয়ে আরও ১৮ লাখ টাকা আদায় করে দালালচক্র। ১৮ দিন আগে গুলিতে মারা গেলেও পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিপন খান দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ায় অবস্থান করে আত্মীয়–স্বজনকে ব্যবহার করে যুবকদের ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে আসছে। আগেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও সে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, লিবিয়ায় তিন যুবকের মৃত্যুসংবাদ আমরা পেয়েছি। থানায় লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দালালদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি