চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জাতীয় বীর বিপ্লবী মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা বিপ্লবী নেতা তারকেশ্বর দস্তিদারের ৯৩তম ফাঁসি দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার(১৩ জানুযারি ) সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লা জে. এম. সেন হল প্রাঙ্গণে মাস্টারদা সূর্য সেনের আবক্ষ মূর্তিতে বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে পুষ্পিত অঞ্জলি নিবেদন করা হয়। পরে সেখানে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার সিঞ্চন ভৌমিক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর ইনচার্জ আল কাদেরী জয়। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন পরিষদের অর্থ সম্পাদক তপন ভট্টাচার্য।
আলোচনায় বক্তব্য রাখেন কমরেড মৃণাল চৌধুরী, কমরেড অশোক সাহা, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুরজিত সেন, সাংবাদিক সুভাষ দে, সাংবাদিক সৈয়দ শিবলী ছাদেক কফিল, রাজনীতিবিদ মিটুল দাশ গুপ্ত, কমরেড সফি উদ্দিন কবির আবিদ, শিক্ষক বিজয় শঙ্কর চৌধুরী, কমরেড দীপা মজুমদার, শ্রমিক নেতা নুরুল হুদা, অধ্যাপক স্বদেশ চক্রবর্তী, কমরেড আসমা আক্তার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অচিন্ত কুমার দাশ, সজল দাশ, কানুরাম দে, নারী নেত্রী সুচিত্রা গুহ টুম্পা ও নিলয় দে।
বক্তারা বলেন, ১৯৩৩ সালের ১৫ জুন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সাজানো তৃতীয় অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২১/১২১-এ ধারায় গঠিত স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল মাস্টারদা সূর্য সেনকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। একই মামলায় তাঁর বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারকেও প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়। এ মামলায় বিপ্লবী কল্পনা দত্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
আলোচকরা আরও বলেন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে একসূত্রে গাঁথা। বিপ্লবীদের দেখানো পথ অনুসরণ করেই এ দেশের মানুষ সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে।
বক্তারা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে হাত ধোয়া দিবস থেকে শুরু করে অসংখ্য দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হলেও প্রায় ২০০ বছরব্যাপী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সংগ্রাম ও বিদ্রোহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় না। এটি জাতির জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অথচ এসব দিবস পালন করতে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত কোনো অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন নেই।
তারা বলেন, যে জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস যত দীর্ঘ, সে জাতি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে তত বেশি সমৃদ্ধ। সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের ধারক। সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেলে জাতি তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলে।
বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে পরিকল্পনাহীনতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে অনেক ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর জন্য হীন স্বার্থলোভী রাজনীতিবিদ ও দীর্ঘদিন ধরে দেশ পরিচালনাকারী সরকারগুলো দায়ী।
আলোচনা সভা থেকে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়— সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ দিবস, সিপাহী বিদ্রোহ দিবস, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা দিবস, যুব বিদ্রোহ দিবস, মাস্টারদা সূর্য সেন ও বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি দিবস, বীরকন্যা প্রীতিলতার আত্মাহুতি দিবসসহ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। বক্তারা জানান, গত ১২ বছর ধরে তারা এই দাবি জানিয়ে আসছেন।
পরিশেষে বক্তারা বলেন, যতদিন এ দেশে সংগ্রামী মানুষ থাকবে, ততদিন মাস্টারদা সূর্য সেন ও বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার প্রেরণার উৎস হয়ে জনমানসে চির জাগরূক হয়ে থাকবেন।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি