| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

উৎসবের অর্ঘ্যে দেবী, বাস্তবের প্রান্তরে অবহেলিতা নারী

reporter
  • আপডেট টাইম: মার্চ ০৮, ২০২৬ ইং | ১৭:০৭:০৩:অপরাহ্ন  |  ৪৪৮৯৯৩ বার পঠিত
উৎসবের অর্ঘ্যে দেবী, বাস্তবের প্রান্তরে অবহেলিতা নারী

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ

সমাজ নামক এই বহুমাত্রিক নির্মাণের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো—এখানে নারীকে একই সঙ্গে পূজিতও করা হয়, আবার উপেক্ষিতও করা হয়। সভ্যতার অলঙ্কার হিসেবে তাকে দেবীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করা হয়; অথচ বাস্তব জীবনের অনাবৃত প্রেক্ষাপটে সেই নারীকেই প্রায়শই দেখা যায় অবহেলার প্রান্তভূমিতে, নীরব বঞ্চনার অন্ধকারে। এই দ্বৈততা কেবল সামাজিক মনস্তত্ত্বের এক কৌতূহলোদ্দীপক দিক নয়; বরং এটি আমাদের সামষ্টিক নৈতিকতার গভীর অন্তঃসারশূন্যতারও এক নির্মম প্রতিফলন।

প্রতি বছর ৮ মার্চ এলে পৃথিবী যেন হঠাৎ করেই নারীময় হয়ে ওঠে। সভা-সেমিনার, আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রঙিন উচ্চারণ—সবখানেই নারীর ক্ষমতায়ন, মর্যাদা ও সমতার বাগ্মিতা প্রতিধ্বনিত হয়। নারীকে অভিনন্দিত করা হয়, তাকে সম্মাননার ফুলে সিক্ত করা হয়, তার সংগ্রামের ইতিহাসকে উচ্চকণ্ঠে স্মরণ করা হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সম্মান কি কেবল এক দিনের অলঙ্কার? এই উৎসব কি কেবল সামাজিক ভদ্রতার আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনী? কারণ ৮ মার্চের উল্লাস নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন সমাজ আবার তার চিরাচরিত নীরবতায় ফিরে যায়—যেখানে নারীর সংগ্রাম, তার কণ্ঠ, তার ব্যথা ও তার অধিকার প্রায়শই অদৃশ্য হয়ে থাকে।

আমাদের সামাজিক চেতনায় নারীর অবস্থান এক গভীর বৈপরীত্যের মধ্যে আবদ্ধ। সাহিত্যে, পুরাণে ও সংস্কৃতির অলঙ্করণে নারীকে দেবীরূপে মহিমান্বিত করা হয়; কিন্তু সামাজিক বাস্তবতায় সেই নারীই বহু ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন, বৈষম্য ও সহিংসতার মুখোমুখি হন। এই দ্বৈততার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক নির্মম সত্য—নারীকে দেবী হিসেবে পূজা করা যত সহজ, মানুষ হিসেবে তার অধিকার স্বীকার করা ততটাই কঠিন।

নারী দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য কিন্তু কোনো উৎসবের আড়ম্বর নয়; বরং এটি এক দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহাসিক স্মারক। শ্রমক্ষেত্রে সমঅধিকার, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার দাবিতে যে আন্দোলন একসময় পৃথিবীর বহু প্রান্তে নারীদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছিল, সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতাই আজকের নারী দিবস।

কিন্তু যখন এই দিবসটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার অলঙ্কারে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার অন্তর্নিহিত দর্শন ক্রমশ ম্লান হয়ে যায়। ফুলের তোড়া, সম্মাননার ফলক কিংবা বক্তৃতার বাগাড়ম্বর নারীর প্রকৃত মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে না। কারণ সম্মান কখনো ভাষণের অলঙ্কার নয়; এটি আচরণের নীরব বাস্তবতায় প্রতিফলিত হয়।

একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় সেই সমাজে নারীর অবস্থানের মাধ্যমে। যেখানে নারী নিরাপত্তাহীন, অবমূল্যায়িত এবং কণ্ঠহীন—সেখানে উন্নয়নের সকল পরিসংখ্যান শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়ে।

অতএব নারী দিবস আমাদের জন্য কেবল অভিনন্দনের উপলক্ষ নয়; এটি আত্মসমালোচনার এক কঠোর আহ্বান। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—নারীকে দেবীর আসনে প্রতিষ্ঠা করার আগে তাকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে শিখতে হবে।

৮ মার্চের উল্লাস তখনই সত্যিকার অর্থে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে, যখন তার প্রতিধ্বনি কেবল উৎসবের মঞ্চে নয়, বরং বছরের প্রতিটি দিনে, প্রতিটি সামাজিক আচরণে এবং প্রতিটি নৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হবে। অন্যথায় নারী দিবস কেবল একটি প্রতীকী আয়োজন হিসেবেই থেকে যাবে—যেখানে উৎসবের মঞ্চে নারী দেবী, আর বাস্তবের প্রান্তরে তিনি এক নীরব অবহেলার নাম।

লেখক: কবি ও শিক্ষার্থী

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪