আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের সামরিক অবরোধের ফলে ইরানের সমুদ্রপথে আমদানি-রপ্তানি কার্যত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চলমান যুদ্ধ অবসানে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু হতে পারে,যা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো তেলের দাম কমিয়েছে।
ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা আগামী দুই দিনের মধ্যে পাকিস্তানে পুনরায় শুরু হতে পারে। সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আশাবাদী।
এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আগামী দুই দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ২১ এপ্রিল শেষ হতে যাওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। চুক্তি হলে সেটাই ভালো, কারণ তখন তারা পুনর্গঠন করতে পারবে,যোগ করেন তিনি।
পাকিস্তান, ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সপ্তাহেই দুই দেশের প্রতিনিধিরা আবার পাকিস্তানে আলোচনায় বসতে পারেন। যদিও এক জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র জানিয়েছে, এখনো নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঠিক হয়নি।
তবে কূটনৈতিক আশাবাদের মাঝেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরানের বন্দরে আসা-যাওয়া করা আরও জাহাজ ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা চীনা মালিকানাধীন তেলবাহী জাহাজ ‘রিচ স্টারি’, যা পারস্য উপসাগর ছেড়ে আবার হরমুজ প্রণালীর দিকে ফিরে গেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানান, অবরোধ শুরুর ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের সমুদ্রপথে অর্থনৈতিক বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, ইরানের অর্থনীতির প্রায় ৯০ শতাংশই এই সমুদ্রপথনির্ভর বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, সোমবার থেকে শুরু হওয়া অবরোধের পর তারা ইরান-সংশ্লিষ্ট অন্তত আটটি তেলবাহী জাহাজ আটক করেছে।
ট্রাম্প নিউ ইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মধ্যস্থতায় আলোচনা আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জর্জিয়ায় এক অনুষ্ঠানে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি বড় ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে চান ট্রাম্প, কিন্তু দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। এই সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়।
কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বৈশ্বিক মানদণ্ডের তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে এশিয়ার শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে এবং ডলারের দর স্থিতিশীল হয়েছে।
তবে সরবরাহ সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলবাহী জাহাজের ওপর দেওয়া ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা ছাড় আর নবায়ন করবে না বলে জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেলের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ছাড়ের মেয়াদ শেষ হতে দেওয়া হয়েছে।
চলমান সংঘাতের ফলে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, যা বিশ্বে তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এতে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো বিকল্প সরবরাহের সন্ধানে হিমশিম খাচ্ছে।সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে,এর মধ্যে ইরানে প্রায় ৩ হাজার এবং লেবাননে ২ হাজার।
আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দিয়েছে, ইরানকে ২০ বছরের জন্য সব ধরনের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে। বিপরীতে তেহরান ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে বক্তব্য দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখার সময়সীমা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং আস্থার ভিত্তি তৈরির জন্য ইরান সমঝোতায় আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র আরও চায়, ইরানের সব সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়া হোক। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে, তাদের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
পাকিস্তানে আলোচনায় যুক্ত এক সূত্র জানিয়েছে, পর্দার আড়ালে চলা আলোচনা কিছুটা অগ্রগতি এনেছে এবং দুই পক্ষই একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
শান্তি প্রক্রিয়ায় নতুন জটিলতা তৈরি করেছে লেবানন পরিস্থিতি। ইসরায়েল ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে।যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, এই হামলা যুদ্ধবিরতির আওতার বাইরে। তবে ইরান দাবি করছে, এটি যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন।
এদিকে যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপানসহ আরও কয়েকটি দেশ লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। গত মাসে তিনজন ইন্দোনেশীয় শান্তিরক্ষী নিহত হওয়ার পর এ আহ্বান জানানো হয়।
তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং দ্রুত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে। রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি