তাওহীদাহ্ রহমান নূভ:
আজ (২৮ মে) পঞ্জিকার পাতায় এক অদ্ভুত ও নির্মম সমাপতন। একদিকে বিশ্ব ক্ষুধা দিবসের করুণ সানাই, অন্যদিকে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদের আনন্দ-কোলাহল। উৎসবের এই প্রখর আলো যখন এদেশের সুউচ্চ অট্টালিকার ড্রয়িংরুমে, সুসজ্জিত ডাইনিং টেবিলে পোলাও-কোর্মার সুবাসিত বাষ্প হয়ে উড়ছে, ঠিক তখনই তার সমান্তরালে, শহরের কোনো এক অন্ধকার গলিতে কিংবা ধূলিধূসরিত চরের ভাঙা উঠোনে এক অবিনাশী অন্ধকার জঠরজ্বালা হয়ে ডানা মেলছে। আজকের এই দিনটি যেন এক বিশাল আয়না, যা আমাদের প্রবৃদ্ধির জাঁকজমকপূর্ণ অবয়বের পেছনে লুকিয়ে থাকা এক কঙ্কালসার বাস্তবতাকে উলঙ্গ করে দেয়। আমরা যখন জিডিপির মায়াবী অঙ্কে বুঁদ হয়ে থাকি, তখন ক্ষুধার্ত শিশুর চোখের জল সেই অঙ্ককে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী পাঁচ দশকে আমাদের শস্যভাণ্ডার উপচে পড়েছে, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—রাষ্ট্রের সেই ঐশ্বর্যের মহাসমুদ্র থেকে সাধারণ মানুষের পাত পর্যন্ত কতটুকু জল পৌঁছাল? আমরা কি আসলেই ক্ষুধা মুক্ত হতে পারলাম, নাকি ক্ষুধার অবয়ব বদলে তাকে আরও প্রখর, আরও অদৃশ্য করে তুললাম?
পরিসংখ্যানের ধূসর ক্যানভাস: উৎসবের দিনে ক্ষুধার হাহাকার
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং আন্তর্জাতিক পুষ্টি সমীক্ষাগুলোর পাতা ওল্টালে যে চিত্রটি বেরিয়ে আসে, তা কোনো সুসংবাদ নয়, বরং এক দীর্ঘশ্বাসের খতিয়ান। দেশের প্রায় এক-দশমাংশ মানুষ এখনো তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কাঁটাতারে বন্দী। উৎসবের এই দিনে, যেখানে ক্যালরির মহোৎসব হওয়ার কথা, সেখানে লক্ষ লক্ষ শিশু ঘুমায় আধপেটা বা খালি পেটে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের এক বিশাল অংশ ‘স্টান্টিং’ বা খর্বতার শিকার; অর্থাৎ, ক্ষুধার করাল গ্রাস তাদের হাড়ের মজ্জা থেকে শুষে নিয়েছে বৃদ্ধির সঞ্জীবনী সুধা।
এ যেন এক মহাজাগতিক ভোজের টেবিল, যেখানে গুটিকয়েক মানুষ উদরপূর্তি করছে, আর মেঝের কার্পেটে বসে একদল শিশু কুড়িয়ে নিচ্ছে সেই ভোজের উচ্ছিষ্ট। উৎসবের দিনে একবেলার জন্য হয়তো কোনো সহৃদয় ব্যক্তির দেওয়া (খয়রাত) মাংসে তাদের পাত সিক্ত হয়, কিন্তু সেই ক্ষণিক তৃপ্তি আসলে ক্ষুধার স্থায়ী সমাধান নয়; তা কেবল কালকের তীব্রতর ক্ষুধার এক পৈশাচিক ট্রেইলার মাত্র।
রাষ্ট্রের অন্ধবিন্দু: যেখানে উৎসব আর অভাবের নদী মেশেনি
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গৌরবগাথা যখন রাষ্ট্রীয় মঞ্চে উচ্চৈঃস্বরে গাওয়া হয়, তখন পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় বণ্টনের এক মহাসমুদ্রসম বৈষম্য। রাষ্ট্র কেন তার নাগরিকদের পাত থেকে এই ক্ষুধা উপড়ে ফেলতে পারল না, তার ব্যবচ্ছেদ করলে কিছু নির্মম সত্য বেরিয়ে আসে:
১. সিন্ডিকেটের রাক্ষুসে হা এবং রাষ্ট্রের ঠোঁট উল্টানো নীতি:
বাজার আজ কোনো মুক্ত অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নয়, তা যেন একদল অদৃশ্য পুঁজিপতির শিকারভূমি। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে ডিমের দাম পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয় গুটি কয়েক মহাজনের ইশারায়। এই কৃত্রিম মূল্যস্ফীতির রাক্ষুসে হা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে গিলে খেয়েছে। মধ্যবিত্ত আজ থালা থেকে প্রোটিন ছেঁটে ফেলছে, আর নিম্নবিত্তের পাত হয়ে পড়েছে ধু-ধু বালুচর। রাষ্ট্র এখানে কঠোর চাবুকহাতে দাঁড়াতে পারত, কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই চাবুক কেবলই বাতাসে আস্ফালন করেছে, সিন্ডিকেটের গায়ে লাগেনি।
২. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ফুটো থালা:
টিসিবি কিংবা ওএমএস-এর লাইনে দাঁড়ানো মানুষের দীর্ঘ সারি দেখলে মনে হয় এ যেন এক দীর্ঘশ্বাসের মিছিল। রাষ্ট্র যেটুকু সাহায্য বরাদ্দ করে, তা প্রয়োজনের তুলনায় সাগরে এক ফোঁটা শিশিরের মতো। তদুপরি, সেই ফুটো থালায় পুষ্টিকর খাবারের কোনো স্থান নেই; আছে কেবল বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাল-আটা। উপরন্তু, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির উইপোকা সেই সহায়তার তালিকাটিকেও প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে, যার ফলে প্রকৃত ক্ষুধার্ত মানুষটি লাইনের বাইরেই দাঁড়িয়ে থেকে যায়।
৩. ‘পেট ভরানো’ বনাম ‘পুষ্টির’ মায়াজাল:
রাষ্ট্রের নীতি বরাবরই ছিল ভাতের জোগান দেওয়া। কিন্তু শুধু কার্বোহাইড্রেটের স্তূপে কি মানুষের মেধা আর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে? ডাল, ডিম, দুধ কিংবা শাকসবজির মতো মৌলিক পুষ্টি উপাদানগুলোকে সাধারণ মানুষের জন্য সস্তা ও সহজলভ্য করার কোনো মহাপরিকল্পনা রাষ্ট্র কখনোই আঁকেনি। ফলে এদেশের শিশুরা ভাত খেয়ে হয়তো পেট ভরাচ্ছে, কিন্তু তাদের কোষগুলো রয়ে যাচ্ছে পুষ্টিহীনতার এক নীরব দুর্ভিক্ষে।
ক্ষুধা কেবল পাকস্থলীর শূন্যতা নয়, ক্ষুধা হলো একটি রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তির অবমাননা। যখন একটি শিশু ঈদের চাঁদের চেয়েও গোল একটি রুটির স্বপ্ন দেখে, তখন বুঝতে হবে আমাদের উন্নয়নের ফানুসটি কতটা অন্তঃসারশূন্য।
মেঘ কেটে আলোর দিশা: রাষ্ট্রের যা করণীয় ছিল এবং আছে
এই অন্ধকার থেকে আলোর বৃত্তে ফিরতে হলে রাষ্ট্রকে তার প্রচলিত দয়া-দাক্ষিণ্যের চাদরটি সরাতে হবে। ক্ষুধা মুক্তি কোনো দান নয়, এটি নাগরিকের অধিকার। রাষ্ট্রকে অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে হবে:
সংবিধানের পাত থেকে ভাতের থালায়: খাদ্য অধিকার আইন:
খাদ্যকে কেবল মৌলিক চাহিদার তকমায় বন্দি না রেখে আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপান্তর করতে হবে। কোনো নাগরিক অনাহারে থাকলে তার দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে এবং এর জন্য আদালতে জবাবদিহির আইন প্রণয়ন করতে হবে।
সর্বজনীন পুষ্টি কার্ড ও রেশনিং ব্যবস্থা:
শহরের বস্তি থেকে শুরু করে দূরবর্তী চরাঞ্চল পর্যন্ত প্রতি ইঞ্চি অবহেলিত জনপদকে একটি সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। শুধু চাল-গম নয়, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর জন্য দুধ, ডিম এবং গর্ভবতী মায়েদের জন্য বিশেষ পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে।
বাজারের অদৃশ্য হাত ভেঙে দেওয়া:
কৃষক মাঠ পর্যায়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে ফসল ফলায়, তা ভোক্তার পকেটে আসার আগেই মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে চলে যায়। রাষ্ট্রকে এই সাপ্লাই চেইনের আমূল সংস্কার করতে হবে। বাজার তদারকি সংস্থাকে কেবল লোকদেখানো জরিমানা নয়, বরং বাজার ধ্বংসকারী কার্টেলগুলোকে চিরতরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আইনি ক্ষমতা ও সাহস দেখাতে হবে।
ভবিষ্যতের জন্য প্রথম ১০০০ দিনের পুষ্টি স্কিম:
একটি শিশুর মাতৃগর্ভে আসার প্রথম দিন থেকে তার দুই বছর বয়স পর্যন্ত সময়টি তার মস্তিষ্কের ও শরীরের গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রকে এই ১০০০ দিনের জন্য প্রতিটি দরিদ্র মায়ের পুষ্টি ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করতে হবে। এটি কোনো অনুদান নয়, এটি আগামী দিনের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার সবচেয়ে মোক্ষম বিনিয়োগ।
উৎসবের আলো হোক সর্বজনীন
আজকের এই যৌথ দিবসের ক্রসরোডে দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবার সময় এসেছে। ঈদের খুশি আর বিশ্ব ক্ষুধা দিবসের কান্না যেন একই মাটিতে দুই মেরুর বাসিন্দা হয়ে না থাকে। রাষ্ট্র যখন জিডিপির খেরোখাতা বন্ধ করে দেশের সবচেয়ে অবহেলিত, ছিন্নমূল শিশুটির ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলতে পারবে—যখন ঈদের দিনের পোলাওয়ের সুবাস আর বস্তির ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না একসঙ্গে বাতাসে ভাসবে না—তখনই কেবল আমরা বলতে পারব, আমরা একটি রাষ্ট্র হতে পেরেছি। ক্ষুধা মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে স্লোগানের খাঁচা থেকে মুক্ত করে প্রতিটি নাগরিকের ভাতের থালায় রূপান্তর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। উৎসবের আলো তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তা প্রতিটি ঘরের অন্ধকার রান্নাঘরকে আলোকিত করবে।
লেখক: কবি ও সম্পাদক (কবিয়াল)