সায়েম উদ্দিন:
আবারও সেই চেনা জোয়ারে ভাসছে পুরো বাংলাদেশ। উত্তর গোলার্ধের তীব্র গ্রীস্মের তাপদাহ ছাপিয়ে বিশ্ব ক্রীড়াজগতের সবচেয়ে বড় মহোৎসব ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ মাঠে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই এক জাদুকরী ফুটবল জরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। আমাদের নিজেদের ফুটবল পরিকাঠামো বা আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং যা-ই বলুক না কেন, বিশ্বকাপ এলে এই ভূখণ্ডের মানুষের আবেগ যেন সমস্ত ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে যায়। হাজার হাজার মাইল দূরের একেকটি লাতিন বা ইউরোপীয় দেশ রাতারাতি হয়ে ওঠে প্রতিটি বাঙালির ঘরের দল। এটি এমন এক উন্মাদনা, যা বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা খোদ ফিফাকেও বারবার বিস্মিত করে এবং ভাবিয়ে তোলে।
বিশ্বকাপের দামামা বাজলেই আমাদের নাগরিক সমাজে একদল দর্শককে ‘মৌসুমি সমর্থক’ বা ১-১.৫ মাসের দর্শক বলে আখ্যা দেওয়া হয়। সমালোচকদের একাংশ একে স্রেফ ‘হুজুগ’ বলে নাকচ করতে চান। যাঁরা বছরের অন্য সময়ে আন্তর্জাতিক ক্লাব ফুটবলের নিয়মিত খবর রাখেন না কিংবা অফসাইডের জটিল সমীকরণ পুরোপুরি বোঝেন না, তাঁরাও এই এক-দেড় মাস খাঁটি ফুটবল বোদ্ধা বনে যান। তবে সমাজতাত্ত্বিক কোণ থেকে দেখলে, এটি শুধুই হুজুগ বা সাময়িক সস্তা বিনোদন নয়; এটি আসলে এ দেশের নিজস্ব এক অনন্য উৎসবের সংস্কৃতি। বাঙালির উৎসবের তালিকায় এই ফুটবল বিশ্বকাপ এখন এক স্থায়ী এবং অপরিহার্য অনুষঙ্গ। এখানে ফুটবল নিয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকাটা জরুরি নয়, বরং চারপাশের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে শামিল হওয়াটাই আসল কথা।
এই উন্মাদনার সবচেয়ে সুন্দর এবং মানবিক দিক হলো, এটি বয়স, লিঙ্গ বা অর্থনৈতিক শ্রেণির কোনো দেয়াল মানে না। শিশু থেকে বৃদ্ধ-সবাই মেতে ওঠেন প্রিয় দলের শক্তিমত্তা আর প্রতিপক্ষের দুর্বলতার চুলচেরা বিশ্লেষণে। সাত বছরের যে শিশুটি ফুটবলের ব্যাকরণ বোঝে না, সেও বাবার কাছে বায়না ধরে প্রিয় দলের নতুন জার্সির জন্য। অন্যদিকে, সত্তর বছরের যে বৃদ্ধটি হয়তো বার্ধক্যজনিত কারণে ঘরের বাইরে বের হতে পারেন না, তিনিও চায়ের দোকানে বসে মেতে ওঠেন মারাদোনা-পেলের পুরনো দিনের অম্লমধুর ফুটবল তর্কে। দর্জিপাড়ায় মাইলের পর মাইল লম্বা পতাকা বানানোর প্রতিযোগিতা, পাড়ার মোড়ে মোড়ে বাঁশের মাথায় ওড়ানো ভিনদেশি পতাকা, কিংবা নিজের পুরো বাড়িকে প্রিয় দলের পতাকার রঙে রাঙিয়ে দেওয়া-এই সবই প্রমাণ করে ফুটবল আমাদের কাছে শুধু একটা খেলা নয়, এটি বাঙালির এক যৌথ সামাজিক উৎসব।
ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা মানেই হচ্ছে ‘রাত জাগার উৎসব’। আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপের অধিকাংশ বড় ম্যাচগুলোও বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে, শেষ রাতে কিংবা ভোর সকালে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এবারের সূচিতে কিছুটা বৈচিত্র্য রয়েছে-কিছু ম্যাচ আমাদের সময় অনুযায়ী ভরদুপুরে বা পড়ন্ত বিকেলে শুরু হচ্ছে, আর মূল আকর্ষণগুলো থাকছে গভীর রাতে। এই সময়ের তারতম্য সত্ত্বেও বাঙালির ফুটবলপ্রেমের রুটিন কিন্তু একটুও বদলায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোর টিএসসি, হল কিংবা পাড়া-মহল্লার খোলা জায়গায় বিশালাকার প্রজেক্টরে বা খোলা স্ক্রিনে একসঙ্গে বসে খেলা দেখার যে সংস্কৃতি, তা যেন এ দেশের তারুণ্যের এক অনন্য নৈশকালীন মিলনমেলায় রূপ নেয়। মাঝরাতে গোল হওয়ার পর পুরো পাড়া কাঁপিয়ে যে সমস্বরে চিৎকার ওঠে, তা কেবল এই বাংলাদেশেই সম্ভব।
বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনা মানেই মূলত দুটি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রঙে ভাগ হয়ে যাওয়া—আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা আর ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ। এই দুই দলের সমর্থকদের বাকযুদ্ধ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রল-সংস্কৃতি উৎসবের রঙকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে এই দুই পরাশক্তি ছাড়াও জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় ফুটবল শক্তির যেমন বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে, তেমনি মরক্কো বা সৌদি আরবের মতো কোনো ইসলামিক দেশ কিংবা এশিয়ার অন্য কোনো দেশের চমকপ্রদ পারফরম্যান্সের প্রতিও এ দেশের মানুষের একচেটিয়া মানসিক সমর্থন ও ভালোবাসা থাকে। অনেকে বুঝে সমর্থন করেন, অনেকে না বুঝেই ভালোবাসেন-কিন্তু এই ভালোবাসার গভীরতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
বাঙালির এই নিঃস্বার্থ এবং নিখাদ উন্মাদনা কিন্তু বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও ক্রীড়া দুনিয়ারও নজর কেড়েছে। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, ব্রাজিলের মূলধারার গণমাধ্যম যেমন জি গ্লোবো এবং খোদ ফিফা তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে বাংলাদেশের সমর্থকদের এই অকৃত্রিম ফুটবলপ্রেমের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করে একাধিকবার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। নিজেদের দেশ বিশ্বমঞ্চে না খেলেও, স্রেফ ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার কারণে একটি পুরো জাতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এতটা আলোচিত হতে পারে, তা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক বিরল নজির।
মৌসুমি ব্যবসার অর্থনীতিতেও এই উন্মাদনা এক বিশাল জোয়ার নিয়ে আসে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দেশের পোশাক কারখানা, দর্জিপাড়া এবং ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকার জার্সি ও পতাকা বিক্রির যে অর্থনৈতিক লেনদেন হয়, তা আমাদের অর্থনীতিতে এক ইতিবাচক সাড়া ফেলে। বড় বড় রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ফুটবলপ্রেমীদের আকৃষ্ট করতে বিশেষ অফারের আয়োজন করে।
দিনশেষে বলা যায়, আমাদের যাপিত জীবনের শত ব্যস্ততা, তীব্র মূল্যস্ফীতির চাপ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর নাগরিক ক্লান্তির মাঝে এই ফুটবল বিশ্বকাপ আমাদের এক পশলা মুক্তির আনন্দ ও অনাবিল স্বস্তি নিয়ে আসে। কে কতটুকু ফুটবল টেকনিক বুঝল, আর কে কতদিনের সমর্থক—সেই তাত্ত্বিক হিসাবনিকাশ এখানে একেবারেই তুচ্ছ। শিশু থেকে বৃদ্ধের এই যে সম্মিলিত উল্লাস, একটা জয়ের পর সব ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার যে যৌথ শিহরণ-এটাই বাংলাদেশের আসল ফুটবল সৌন্দর্য। মাঠের জয়-পরাজয় কিংবা ট্রফি কার ঘরে গেল সেই হিসাব দিনশেষে তোলা থাক, জয় হোক মাঠের বাইরের এই অকৃত্রিম মানবীয় আবেগের।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী