| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ইরান চুক্তি নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভের মুখে পড়তে পারেন নেতানিয়াহু

reporter
  • আপডেট টাইম: জুন ১৭, ২০২৬ ইং | ১৮:০৮:৩৬:অপরাহ্ন  |  ১৬৯৯৯৩১ বার পঠিত
ইরান চুক্তি নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভের মুখে পড়তে পারেন নেতানিয়াহু
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আগামী শরতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর আশা আগেই নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তী চুক্তি তার সামনে নতুন একটি রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ হওয়ার আগেই ইরান ও লেবাননের যুদ্ধের ইতি টানার পথ বেছে নিয়েছেন। ফলে মার্চ মাসে নেতানিয়াহুর দেওয়া “আমরা মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিচ্ছি” মন্তব্যটি এখন অনেকটাই ফাঁপা বলে মনে হচ্ছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে নিরাপত্তা ব্যর্থতা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে আগেই চাপে ছিলেন ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু। এখন ভোটাররা তার যুদ্ধ পরিচালনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কীভাবে সামলেছেন, তারও মূল্যায়ন করবেন।

এ সপ্তাহে নেতানিয়াহু নিশ্চিত করেছেন যে, অক্টোবরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে তিনি আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, তার ডানপন্থী জোট পরাজয়ের পথে রয়েছে। তবে ১৯৯০-এর দশক থেকে দীর্ঘ সময় ইসরায়েলের রাজনীতিতে আধিপত্য বজায় রাখা নেতানিয়াহু নতুন করে সরকার গঠনের সমীকরণ দাঁড় করাতে পারেন—এ সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেক ইসরায়েলি।

স্থায়ী বিজয় অধরাই

ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে একসময় তার সমর্থকেরা “কিং বিবি” বলে ডাকতেন। তবে সমালোচকদের কাছে তিনি সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত নেতাদের একজন।

তার দল লিকুদ নেতানিয়াহুকে এমন এক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নেতা হিসেবে তুলে ধরে, যিনি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি ঠেকিয়েছেন এবং ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

২০২৫ সালে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, “জর্ডান নদীর পশ্চিমে কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র হবে না। প্রচণ্ড আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও আমি বহু বছর ধরে সেই সন্ত্রাসী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকিয়ে রেখেছি।”

তবে হামাসের ২০২৩ সালের হামলার আগে নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে সামরিক সাফল্য এলেও স্থায়ী বিজয় না পাওয়ায় তার কঠোর নেতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সামরিক প্রাণহানির পাশাপাশি কয়েক দশ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

দেশের ভেতরে সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু গাজা সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের পরিবর্তে অন্যদিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন এবং হামাসকে বাস্তব হুমকি হিসেবে গুরুত্ব দেননি।

যদিও গাজায় যুদ্ধের প্রতি অধিকাংশ ইসরায়েলির সমর্থন ছিল, তবে যুদ্ধ পরিচালনায় নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে অনেকে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। বেশ কয়েকজন সাবেক জেনারেল এবং জিম্মিদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, তার কোনো সুস্পষ্ট কৌশল ছিল না।

হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়া ইসরায়েলে উদযাপিত হয়েছিল। কিন্তু হামাস এখনো গাজার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, ইরানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা বহাল রয়েছে এবং লেবাননে হিজবুল্লাহও টিকে আছে।

বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় নতুন ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর বলেন, “নেতানিয়াহু যুদ্ধে হেরে গেছেন। তিনি কিছুই দিতে পারেননি। সংকটময় মুহূর্তে তিনি ভেঙে পড়েছেন।”

তবে নেতানিয়াহু এসব সমালোচনাকে ইসরায়েলের অর্জনকে খাটো করার প্রচেষ্টা বলে দাবি করেন।

ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আমরা যদি সময়মতো এবং প্রবল শক্তি দিয়ে পদক্ষেপ না নিতাম, তাহলে আজ আমরা এখানে থাকতাম না।”

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান

গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে বিদেশে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উঠেছে, যা তেল আবিব প্রত্যাখ্যান করে। একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে, যাকে তিনি ‘হাস্যকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন আদায়ে সক্রিয় থাকলেও তিনি বিভিন্ন সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং অন্যান্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছেন।

এক জীবনীগ্রন্থে দাবি করা হয়েছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ব্যক্তিগত আলোচনায় নেতানিয়াহুকে ‘সন অব আ বিচ’ এবং ‘খুব খারাপ মানুষ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার কারণে শান্তি প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার আন্তর্জাতিক চাপও বেড়েছে।

অন্যদিকে অনেক ইসরায়েলি মনে করেন, হামাসের হামলার পর গাজায় তাদের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা ছিল অন্যায্য। বিরোধীরা আবার নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নতি স্বীকারের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।

মার্কিন রাজনীতিতে রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় সমর্থনকে দুর্বল করেছে। দুই দলের ভোটারদের মধ্যেই ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমছে।

ট্রাম্প, যিনি নেতানিয়াহুর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মার্কিন মিত্র ছিলেন, জুন মাসে এক ফোনালাপে তাকে “পুরোপুরি পাগল” বলে অভিহিত করেছিলেন।

সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী

খ্যাতিমান এক ইতিহাসবিদের পরিবারে জন্ম নেওয়া নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি তার বড় ভাই ইয়োনি নেতানিয়াহুর মতোই ইসরায়েলের অভিজাত কমান্ডো ইউনিটে যোগ দেন। ১৯৭৬ সালে উগান্ডার এনতেবেতে ছিনতাই হওয়া যাত্রীদের উদ্ধারের অভিযানে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ইয়োনি নিহত হন। নেতানিয়াহুর ভাষায়, ওই ঘটনাই তার জীবন বদলে দিয়েছিল।

১৯৯৬ সালে তিনি ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী হন। বসতি স্থাপনকারী, নিরাপত্তাপন্থী, অতিরক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং ব্যবসাবান্ধব ভোটারদের নিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী জোট গড়ে তোলেন।

দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি থাকা অবস্থায়ও ২০২২ সালে তিনি নজিরবিহীন ষষ্ঠ মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরেন। তার সরকারে যোগ দেওয়া জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সম্প্রসারণবাদী নীতি এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্বের উদ্যোগ ২০২৩ সালে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের জন্ম দেয়।

নেতানিয়াহু ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তিকে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এর মাধ্যমে চারটি আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হয়। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে না নিয়েই আরব বিশ্বের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।

কিন্তু ২০২৩ সালের হামাস হামলা এবং গাজা যুদ্ধ সেই পরিকল্পনাকে ভেস্তে দেয়। পশ্চিমা বিশ্বে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নেতানিয়াহুর উত্তরাধিকার এখন আরও তীব্র বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।রয়টার্স 


রিপোর্টার্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪