তাওহীদাহ্ রহমান নূভ :
আজ ২১ জুন, বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায় এই দিবসটি হয়তো খুব বেশি আলোড়ন তোলে না, কিন্তু একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, ভৌগোলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের চাকা সচল রাখার পেছনে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। সহজ কথায়, হাইড্রোগ্রাফি হলো সমুদ্রের ভূগোল ও ভৌত বৈশিষ্ট্য পরিমাপের বিজ্ঞান। সমুদ্রের গভীরতা কত, তার তলদেশের ভূপ্রকৃতি কেমন, জোয়ার-ভাটার গতি এবং স্রোতের আচরণ কেমন—এসব নিখুঁতভাবে জানার একমাত্র উপায় হাইড্রোগ্রাফি।
এ বছর বাংলাদেশ নৌবাহিনী দিবসটির যে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, তা অত্যন্ত দূরদর্শী ও সময়োপযোগী—“সামুদ্রিক তথ্য আদান প্রদানের ধারণায় আমূল পরিবর্তন”। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে সমুদ্রের উপাত্ত বা ডেটা ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে যে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটছে, এই প্রতিপাদ্য মূলত তারই এক বলিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত ঘোষণা।
ইতিহাসের পাতা থেকে: দিবসের প্রেক্ষাপট
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯২১ সালের ২১ জুন সমুদ্রের মানচিত্র তৈরি এবং আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল নিরাপদ করার লক্ষ্যে ‘আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরো’ (যা বর্তমানে International Hydrographic Organization বা IHO নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সমুদ্রবিজ্ঞানের এই অনন্য মাইলফলকটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং সমুদ্রের সুরক্ষায় হাইড্রোগ্রাফারদের অবদানকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে ২০০৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২১ জুনকে ‘বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তখন থেকেই প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে এই দিবসটি গুরুত্বের সাথে উদযাপিত হয়ে আসছে।
সমুদ্রের মানচিত্র: বৈশ্বিক বাণিজ্যের লাইফলাইন
আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, বিশ্বের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই সম্পন্ন হয় সমুদ্রপথে। আর সমুদ্রের এই বিশাল ‘মহাসড়কে’ স্থলপথের মতো কোনো দৃশ্যমান রাস্তা, ডিভাইডার বা ট্রাফিক সিগন্যাল থাকে না। পানির নিচে কোথায় পাহাড় লুকিয়ে আছে, কোথায় বিপজ্জনক চড়া জেগেছে, কিংবা কোথায় কোনো ডুবে যাওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে—তা যদি আগে থেকে নিখুঁতভাবে জানা না থাকে, তবে যেকোনো মুহূর্তে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যিক জাহাজ ও মূল্যবান প্রাণহানির মতো বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।
এখানেই হাইড্রোগ্রাফির ম্যাজিক। হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের মাধ্যমে তৈরি ‘নটিক্যাল চার্ট’ বা নৌ-মানচিত্রই হলো সমুদ্রের চালকদের একমাত্র চোখ। এই চার্ট ছাড়া আধুনিক বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্য সচল রাখা অবাস্তব ও অসম্ভব।
বাংলাদেশের সমুদ্রজয় ও সুনীল অর্থনীতির চাবিকাঠি
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিবসের তাৎপর্য অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে গভীর। ২০১২ এবং ২০১৪ সালে যথাক্রমে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে ঐতিহাসিক সমুদ্রসীমা জয়ের পর আমরা বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের এক বিশাল একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) লাভ করেছি। এই বিশাল জলরাশি আমাদের জন্য ‘সুনীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমির এক অফুরন্ত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
কিন্তু সমুদ্রের এই বিশাল সম্পদ তো আর এমনি এমনি হাতের মুঠোয় আসবে না। সমুদ্রের ঠিক কোথায় মাছের প্রাচুর্য বেশি, কোথায় গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ে তোলার মতো উপযুক্ত গভীরতা রয়েছে, কিংবা কোথায় তেল-গ্যাস ও অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদ লুকিয়ে আছে—তা জানতে হলে সমুদ্রের তলদেশের এক-একটি ইঞ্চির নিখুঁত নকশা আমাদের লাগবেই। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার চাবিকাঠিটি রয়েছে হাইড্রোগ্রাফির হাতে। হাইড্রোগ্রাফিক ডেটা ছাড়া ব্লু-ইকোনমি কেবলই একটি তাত্ত্বিক শব্দ, এর বাস্তবায়ন অসম্ভব।
প্রতিপাদ্যের গভীরতা: তথ্যের আদান-প্রদানে কেন এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন?
ঐতিহ্যগতভাবে হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য বলতে কেবল কাগজের মানচিত্র বা চার্টকেই বোঝানো হতো, যা তৈরি ও আপডেট করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেত। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে সেই চেনা সমীকরণ পুরোপুরি বদলে গেছে।
প্রযুক্তির ছোঁয়া: এখন স্যাটেলাইট, রিমোট সেন্সিং, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ছোঁয়ায় সমুদ্রের গভীরতম অংশের তথ্যও পলকের মধ্যে চলে আসছে টেবিলে।
ডিজিটাল টুইন ও থ্রিডি মডেল: বর্তমানে বৈশ্বিক সমুদ্রবিজ্ঞানে ‘ডিজিটাল টুইন অব দ্য ওশেন’ (Digital Twin of the Ocean) ধারণাটি জনপ্রিয় হচ্ছে। এর অর্থ হলো, বাস্তব সমুদ্রের একটি নিখুঁত ডিজিটাল ও জীবন্ত ত্রিমাত্রিক (3D) প্রতিরূপ তৈরি করা। এর ফলে সমুদ্রের জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক দূষণ এবং জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগের পূর্বাভাস অনেক আগে এবং নির্ভুলভাবে দেওয়া সম্ভব।
সমন্বিত ডেটা শেয়ারিং: সমুদ্রের তথ্য এখন আর কোনো একটি নির্দিষ্ট সংস্থার কাছে বন্দি নেই। এই তথ্যের অবাধ ও নিরাপদ আদান-প্রদানের ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশবিদ, মৎস্য অধিদপ্তর এবং নিরাপত্তা বাহিনী একযোগে কাজ করতে পারছে, যা সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনায় এক আমূল পরিবর্তন আনছে।
জলবায়ু সংকট ও উপকূলীয় সুরক্ষা
বাংলাদেশ একটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত বিপন্ন করছে। হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশের উচ্চতার পরিবর্তন ট্র্যাক করে আমরা বুঝতে পারি যে, জলোচ্ছ্বাসের পানি কতটা ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এই উপাত্তের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের বাঁধ নির্মাণ, সাইক্লোন শেল্টার স্থাপন এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মহাপরিকল্পনা বা ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ প্রণয়ন করা সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অতন্দ্র ভূমিকা
আমাদের দেশের সমুদ্রসীমার সার্বিক সুরক্ষার পাশাপাশি হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ও আন্তর্জাতিক মানের নটিক্যাল চার্ট তৈরির একমাত্র জাতীয় কর্তৃত্ব (National Authority) হলো বাংলাদেশ নৌবাহিনী। নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক পরিদপ্তর আধুনিক জরিপ জাহাজের সাহায্যে প্রতিনিয়ত বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তথ্য সংগ্রহ করছে।
নৌবাহিনী কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্যই মানচিত্র তৈরি করছে না, বরং তাদের তৈরি করা ‘ইলেকট্রনিক নটিক্যাল চার্ট’ (ENC) আজ বিশ্বজুড়ে সমুদ্রগামী বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ব্যবহার করছে। এটি আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থায় (IMO) বাংলাদেশের সক্ষমতা ও মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, স্মার্ট ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যে রূপকল্প নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, তার অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে আমাদের এই বঙ্গোপসাগর। সমুদ্রের এই বিপুল সম্ভাবনাকে টেকসই উপায়ে কাজে লাগাতে হলে হাইড্রোগ্রাফিক গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগ এবং তরুণ বিজ্ঞানীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করা প্রয়োজন।
বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে সামুদ্রিক তথ্যের সঠিক আদান-প্রদান নিশ্চিত করা, যাতে আমাদের অর্থনীতি আরও গতিশীল হয় এবং আমাদের নীল জলরাশি থাকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত।
লেখক: কবি ও সম্পাদক (কবিয়াল)